দেশে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। এক মাসের কম সময়ের মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। ঠিক সেই সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপ নিয়েছে।
গতকাল বুধবার জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। গ্রেড (ধাপ) আগের মতোই ২০টি রাখা হয়েছে। এবার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১ঃ৮, যা আগে ছিল ১ঃ৯.৪। সর্বনিম্ন ধাপে বেতন কাঠামো ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ধাপে বেতন কাঠামো ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব এসেছে।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খান নেতৃত্বে ২৩ সদস্যের কমিশন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সকল সদস্য উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এটি একটি বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বোঝা যায়, এটি সৃজনশীল কাজ হয়েছে।
কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছেন, সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
বেতন বৃদ্ধির ধাপসমূহের বিশদ সুপারিশ অনুযায়ী:
-
২য় ধাপ: ৬৬ হাজার → ১ লাখ ৩২ হাজার
-
৩য় ধাপ: ৫৫,৫০০ → ১ লাখ ১৩ হাজার
-
৪র্থ ধাপ: ৫০,০০০ → ১ লাখ
-
৫ম ধাপ: ৪৩,০০০ → ৮৬,০০০
-
৬ষ্ঠ ধাপ: ৩৫,৫০০ → ৭১,০০০
-
৭ম ধাপ: ২৯,০০০ → ৫৮,০০০
-
৮ম ধাপ: ২৩,০০০ → ৪৭,২০০
-
৯ম ধাপ: ২২,০০০ → ৪৫,১০০
-
১০ম ধাপ: ১৬,০০০ → ৩২,০০০
-
১১তম ধাপ: ১২,৫০০ → ২৫,০০০
-
১২তম ধাপ: ১১,৩০০ → ২৪,৩০০
-
১৩তম ধাপ: ১১,০০০ → ২৪,০০০
-
১৪তম ধাপ: ১০,২০০ → ২৩,৫০০
-
১৫তম ধাপ: ৯,৭০০ → ২২,৮০০
-
১৬তম ধাপ: ৯,৩০০ → ২১,৯০০
-
১৭তম ধাপ: ৯,০০০ → ২১,১০০
-
১৮তম ধাপ: ৮,৮০০ → ২১,০০০
-
১৯তম ধাপ: ৮,৫০০ → ২০,৫০০
অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য ২০ ধাপের বাইরে একটি ধাপ তৈরি করবে, যা পরে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হবে।
নির্বাচনের আগে সরকারের এই পদক্ষেপে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সরকার বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচিত নয়। তাই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নেই।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, সরকারি চাকরিতে ঢালাও বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি বেসরকারি খাতেও বেতন বৃদ্ধির চাপ তৈরি করবে। গত দেড় বছরে বেসরকারি খাতের অবস্থা শোচনীয়। অনেক কলকারখানা বন্ধ, রফতানি আয় কমেছে। ভালো প্রতিষ্ঠানও ঋণ পরিশোধে সমস্যায়। বিনিয়োগ কমায় নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না।
শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে শিল্প সম্প্রসারণ স্থবির হয়ে গেছে। সবচেয়ে চাপে পড়বে পোশাক শিল্প খাত। বেতন বৃদ্ধি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটাবে। অন্য শ্রমঘন শিল্পেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়াও, নতুন পে স্কেল বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়াবে। অতীত গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পে স্কেল ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ৫০–১০০ শতাংশ বাড়ে। এবার তা আরও বেশি হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি বর্তমানে ৮ শতাংশের বেশি। নতুন পে স্কেল চালু হলে এটি ২০–২৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে।
সরকারের রাজস্ব আয় কমে গেছে। চলতি বছরে ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম রাজস্ব হয়েছে। সরকার ব্যাংক ঋণ নিয়ে বেতন ও খরচ মেটাচ্ছে। অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার উৎস কোথায় তা ব্যাখ্যা করা হয়নি।
অতীতেও ঘুষ-দুর্নীতি কমানো ও সরকারি কাজের গতি আনার যুক্তিতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সমস্যার সমাধান হয়নি। অনির্বাচিত সরকার এই সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী সরকারের ওপর চাপ তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকটে থাকা অর্থনীতিতে এটি মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।

