সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮,২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকা এবং প্রথম গ্রেডে ৭৮,০০০ টাকা থেকে এক লাখ ৬০,০০০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। গ্রেডের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও মোট ২০টি ধাপ বর্তমানভাবেই থাকবে।
গতকাল, বুধবার বিকেলে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২১ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে। এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ আছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যেতে পারে।
প্রস্তাবিত পে-স্কেলে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতা ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের পরিবর্তে দশম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত প্রদান করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাড়িভাড়া ভাতা প্রথম থেকে দশম গ্রেডে তুলনামূলক কম এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে।
পেনশনভোগীরাও সুবিধা পাবেন। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশনপ্রাপ্তদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ, ২০–৪০ হাজার টাকার মধ্যে প্রাপ্তদের ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি প্রাপ্তদের ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের চিকিৎসা ভাতা ১০,০০০ টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
নতুন পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, “এক বছরের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা হলেও বাস্তবে পণ্যের দাম কমেনি; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র।”
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা না করে পে-স্কেল বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও বলেন, “সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া অর্থনীতি এখনো মজুরি বাড়ানোর মতো সক্ষমতায় পৌঁছায়নি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি টেকসই হবে না।”
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আশ্বস্ত করেছেন, “সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে বাজার স্থিতিশীল রাখা হবে, ফলে বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে না।” তবে তিনি স্বীকার করেছেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন একটি জটিল বিষয় এবং প্রক্রিয়াটি তিন থেকে চার মাস সময় নিতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মনে করেন, বেতন বাড়লেও বাজারে পণ্যের দাম ইতিমধ্যেই বেড়ে গেলে প্রকৃত সুবিধা পাওয়া কঠিন। “পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকলে বেতন দিয়েই চলা সম্ভব,” এমন মন্তব্য করেছেন তারা। কমিশনের প্রস্তাব তৈরির সময় দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অনলাইনে দুই লাখ ৩৬ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর মতামতও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে আংশিকভাবে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি এবং পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে।

