রাজস্ব আদায় ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে জনগণের মধ্যে কর দেওয়ার মনোবল বাড়ানো কঠিন। করদাতাদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তা যদি দৃশ্যমান না হয়, তাহলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনের ন্যায়বিচারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এমন আলোচনা হয় গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত এক সেমিনারে। বক্তারা বলেন, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর না করে দেশের বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সেমিনারের আয়োজন করে ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ ও ‘বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন)’। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন ফাহিম মাশরুর। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “মানুষ যতক্ষণ দেখতে পাবে না তাদের সংগৃহীত অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, ততক্ষণ কর সম্মতি বৃদ্ধি পাবে না। করদাতাদের অর্থ জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজস্ব ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারের অভাবের কারণে আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে।”
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “দেশের অর্থনীতিতে পুঞ্জীভূত বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলার। ঋণের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন টাইম বোমার উপর অবস্থান করছে। যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নেই বললেই চলে। ফলে যারা রাজস্ব আয় করবেন আর যারা খরচ করবেন, তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনটি জরুরি, কোনটি অপ্রয়োজনীয়, কোনটি অপচয়—এসব সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। সরকার ব্যয় ঠিক করে আয়ের দায়িত্ব এনবিআরকে চাপিয়ে দেয়। এনবিআর কখনও তার সক্ষমতার কথা সরকারকে জানাতে পারে না। চুপচাপ সব মেনে নেয়। এই ব্যবস্থার মধ্যেই করদাতাদের হয়রানির মূলমন্ত্র নিহিত।”
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, “আমি যে কর দিই তার বিনিময়ে আমি কী পাই? অন্যান্য দেশে করদাতারা বিনামূল্যে অনেক সেবা পান। কর প্রদানের পর নাগরিক সুবিধা যদি দৃশ্যমান হয়, মানুষ আরও বেশি কর দিতে আগ্রহী হবে। বর্তমানে দেশের করযোগ্য জনগোষ্ঠীর মাত্র ২০ শতাংশ কর প্রদান করে। বাকি ৮০ শতাংশ কর না দেওয়ায় চাপ পড়ে ওই ২০ শতাংশের ওপর।” বক্তারা বলেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে করদাতাদের অর্থের অপচয় হয়েছে। এর ফলে রাজস্ব প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা কমেছে।
এছাড়াও তারা এনবিআরের ন্যূনতম কর আদায় নীতি সমালোচনা করেন। বলেন, কর ন্যায্যতার প্রশ্নে বাংলাদেশ ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বে একমাত্র বাংলাদেশে উৎসে কর কর্তন করা ন্যূনতম কর ফেরত পাওয়া যায় না। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়লেও এটি প্রযোজ্য হয়। করের মৌলিক দর্শন হলো আয়ের ওপর কর আরোপ করা; আয় না থাকলে কর আরোপের প্রশ্নই আসে না। বাস্তবে কোম্পানিগুলোর কার্যকর করহার ঘোষিত করহারের চেয়ে অনেক বেশি।
অনুষ্ঠানে কর ও রাজস্ব বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ মাহমুদ, অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা অংশীদার স্নেহাশীষ বড়ুয়া, ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক ড. শফিকুর রহমান, ইনোভেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোবায়েত সারওয়ার প্রমুখ বক্তব্য দেন।

