ব্যাংক-বহির্ভূত ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ধের আগে এসব প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখা ব্যক্তি আমানতকারীদের জমা অর্থের পুরোটা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হবে ২ হাজার ৬শ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পর ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে আনুপাতিক হারে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। মালিকপক্ষের জালিয়াতি ও অনিয়মের কারণে ২০১৮ সাল থেকেই এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় পড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে চলতি সপ্তাহে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে শুনানি হয়েছে। শুনানিতে পর্ষদ সদস্যরা প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা নেই বলে জানান এবং অবসায়নে সম্মতি দেন। আগামী সপ্তাহে বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠানের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার আগে শুনানি শেষ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে খারাপ অবস্থায় থাকা ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য সময় চায়। বাকি ৯টি প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় একীভূত বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন পায়।
বন্ধ হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত দিতে না পারা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং তীব্র মূলধন ঘাটতির ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা হয়। অবসায়নের মাধ্যমে ব্যক্তি আমানতকারীর মূল টাকা ফেরতের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিবিধি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।
সাধারণ নিয়মে কোনো প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ক্ষেত্রে সম্পদ বিক্রি করে দায় পরিশোধ করা হয়। এজন্য অবসায়ক নিয়োগ দিয়ে দায়দেনার হিসাব নির্ধারণ করা হয়। পরে সম্পদ বিক্রি করে আনুপাতিক হারে আমানত ফেরত দেওয়া হয়। বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যাংক বন্ধ হলে একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা আমানত বীমা তহবিল থেকে পান। তবে বন্ধ হতে যাওয়া এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে বিশেষ সিদ্ধান্তের আওতায়, বীমা আইনের অধীনে নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরা টাকা ফেরত না পেয়ে চরম দুর্ভোগে ছিলেন। সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা, বিচারপতি ও সেনা কর্মকর্তাসহ নানা শ্রেণির মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যক্তি আমানতকারীদের পুরো টাকা ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এটি জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের বড় অংশ মালিকপক্ষ আত্মসাৎ করেছে। ফলে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কম। অনেক প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত সম্পদও নেই। এফএএস ফাইন্যান্সের মোট ঋণের ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ বা এক হাজার ৮১৪ কোটি টাকা খেলাপি। এর ক্রমপুঞ্জীভূত লোকসান এক হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি এবং লোকসান এক হাজার ১৭ কোটি টাকা। বিআইএফসির ৯৭ দশমিক ৩০ শতাংশ ঋণ খেলাপি এবং লোকসান এক হাজার ৪৮০ কোটি টাকা।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের তিন হাজার ৯৭৫ কোটি টাকার ঋণের ৯৬ শতাংশ খেলাপি। লোকসান চার হাজার ২১৯ কোটি টাকা। পিপলস লিজিংয়ের ৯৫ শতাংশ ঋণ খেলাপি এবং লোকসান চার হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। আভিভা ফাইন্যান্সের ৮৩ শতাংশ বা দুই হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি। লোকসান তিন হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার লিজিংয়ের ৭৫ শতাংশ ঋণ খেলাপি এবং লোকসান ৯৪১ কোটি টাকা। জিএসপি ফাইন্যান্সের ৫৯ শতাংশ ঋণ খেলাপি। লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা। প্রাইম ফাইন্যান্সের ৭৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি এবং লোকসান ৩৫১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সূচক পর্যালোচনা করে মোট ২০টি প্রতিষ্ঠানকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন ক্যাপিটালের ৯৬ শতাংশ, ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ৯৫ শতাংশ, ফিনিক্স ফাইন্যান্সের ৮৩ শতাংশ এবং উত্তরা ফাইন্যান্সের ৮২ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণের বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন অনুযায়ী আমানতকারীর স্বার্থবিরোধী কার্যক্রম, দায় পরিশোধে সম্পদের ঘাটতি এবং মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থতার কারণেই লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে। তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা ছাড়া অর্থ ফেরত দিলে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

