বিমানবন্দর ব্যবহারের বকেয়া পাওনার ওপর সারচার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, বার্ষিক সারচার্জের হার আগের ৭২ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৪.২৫ শতাংশে। এতে দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ থেকে বড় স্বস্তি পেল দেশীয় এয়ারলাইনগুলো।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অ্যারোনটিক্যাল চার্জ বা বিমান চলাচল–সংক্রান্ত বিভিন্ন ফি পরিশোধে বিলম্ব হলে আগের মতো উচ্চ হারে সারচার্জ দিতে হবে না। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বেবিচক দেশের আটটি বিমানবন্দরে ল্যান্ডিং, এয়ার নেভিগেশন, পার্কিং, এমবার্কেশন, রানওয়ে ব্যবহার, কন্ট্রোল রুম সেবা ও টার্মিনাল ব্যবহারের বিপরীতে এসব চার্জ আদায় করে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াবে। এমন এক সময়ে এই উদ্যোগ এলো, যখন ঋণের বোঝা ও পুঞ্জীভূত সারচার্জের কারণে অন্তত তিনটি দেশীয় এয়ারলাইন কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
যদিও এখনই বিমান ভাড়া কমার সম্ভাবনা কম, তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। সেবার মানও উন্নত হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাবেন যাত্রীরা।
নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং এয়ারলাইনস অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান সিদ্ধান্তটিকে খাতের জন্য বড় পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সারচার্জ কমায় বাড়তি চাপ দূর হবে। পরিচালন ব্যয় কমাতেও এটি সহায়ক হবে।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়াবে। সেবার মান উন্নত হবে। যাত্রীদের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে হ্রাসকৃত সারচার্জ আগের বকেয়ার ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিল জমার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করলে কোনো সারচার্জ দিতে হবে না। পরবর্তী ৩০ দিনে বিল পরিশোধ না হলে ১ শতাংশ হারে সারচার্জ প্রযোজ্য হবে।
৬১ থেকে ১২০ দিন বিলম্ব হলে সারচার্জ হবে ১.২৫ শতাংশ। এরপর প্রতি ১২০ দিন বা তার অংশের জন্য ৬ শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপ করা হবে, যতদিন না পুরো পাওনা পরিশোধ হয়।
এর আগে সিভিল এভিয়েশন রুলস ১৯৮৪ অনুযায়ী, বকেয়া বিলের ওপর প্রতি মাসে ৬ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হতো। এতে এক বছর বিলম্ব হলেই সারচার্জ দাঁড়াত মূল অর্থের ৭২ শতাংশে। যা অনেক এয়ারলাইনের জন্য পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র মো. কামরুল ইসলাম বলেন, এই সারচার্জ মূলত পেন্ডিং বিলের ওপর আরোপ করা হতো। হার বেশি হওয়ায় অনেক সময় বিল পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ত। সারচার্জ কমায় পেমেন্ট দেওয়া সহজ হবে। অতিরিক্ত চাপও কমবে।
তিনি বলেন, অতীতে অতিরিক্ত সারচার্জের কারণে একাধিক এয়ারলাইন বন্ধ হয়ে গেছে। ইউএস-বাংলা নিয়মিত পাওনা পরিশোধের চেষ্টা করলেও আগের কাঠামো টিকে থাকার জন্য বড় হুমকি ছিল।
কামরুল ইসলাম আরও বলেন, দেশীয় এয়ারলাইনগুলো কাঠামোগত কিছু সমস্যায়ও ভোগে। তাদের বিমানগুলো ২৪ ঘণ্টা ঢাকায় অবস্থান করে। এতে গ্রাউন্ড টাইম বাড়ে। বিমানবন্দরের সেবা বেশি ব্যবহার করতে হয়। বিপরীতে বিদেশি এয়ারলাইনগুলো এক–দুই ঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছাড়ে। ফলে সারচার্জের চাপ দেশীয় এয়ারলাইনের ওপরই বেশি পড়ে।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, আগের নিয়মের ফলে দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৫১.৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ বা ৫ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা শুধু সারচার্জ।
২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচটি এয়ারলাইন—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, নভোএয়ার, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে এই অর্থ পাওনা রয়েছে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তাদের বকেয়া ৬ হাজার ৬৮.৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সারচার্জই ৪ হাজার ৭৯৪.১৩ কোটি টাকা। মূল বিলের পরিমাণ ৭৪৫.৫২ কোটি টাকা।
বেসরকারি এয়ারলাইনগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ ও জিএমজি এয়ারলাইনস ইতোমধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য ও মূলধনের অভাবের সঙ্গে অতিরিক্ত সারচার্জ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, অস্বাভাবিক সারচার্জ এয়ারলাইনগুলোকে এক দুষ্টচক্রে আটকে ফেলেছিল। কোভিড মহামারি ও বিভিন্ন সংকটে সময়মতো বিল পরিশোধ সম্ভব হয়নি। অতিরিক্ত সারচার্জের কারণে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, এমন শাস্তিমূলক হারের কারণে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরাও সংকটে থাকা এয়ারলাইনগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহ হারান।

