সরকার ও ব্যবসায়ীদের ধারাবাহিক আশ্বাসের পরও দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির সংকট কাটেনি। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না। আবার কোথাও মিললেও নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
বর্তমানে এক হাজার ৩০৫ টাকা দামের ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গুনতে হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকা। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছে। বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় রমজান সামনে রেখে বড় পরিসরে এলপিজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চলতি জানুয়ারি ও আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে মোট তিন লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে শিগগিরই সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) হিসাবে, দেশে মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে শিল্প খাতে। বাকি অংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক কাজে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্যমতে, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ৩২টির নিজস্ব সিলিন্ডার প্লান্ট আছে। আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। এলপিজি ব্যবসার প্রতিটি ধাপেই সরকারের অনুমোদন নিতে হয়।
দেশে এলপিজি আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর ও সীতাকুণ্ডের জেটি দিয়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৮৩ হাজার টন। এ আমদানি করেছে ১৬টি প্রতিষ্ঠান। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এসব আমদানিকারকের কাছ থেকে এলপিজি কিনে সিলিন্ডারে ভরে বাজারে সরবরাহ করে।
রমজানে ভোগান্তি কমাতে ব্যবসায়ীরাও আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১২টি প্রতিষ্ঠান এক লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন এলপিজি আমদানি করবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো নাভানা এলপিজি লিমিটেড, টিএমএসএস এলপিজি লিমিটেড, এসকেএস এলপিজি, বিএন এনার্জি (বিডি) লিমিটেড, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি লিমিটেড, জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড, ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, যমুনা স্পেকটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড, লাফ্স গ্যাস লিমিটেড, ডেলটা এলপিজি লিমিটেড, ইউনাইটেড আইগ্যাজ এলপিজি লিমিটেড এবং মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠান ফেব্রুয়ারি মাসে আরও এক লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টন এলপিজি আমদানি করবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ব্যবহৃত এলপিজির ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর। আমদানির প্রায় পুরোটা করে বেসরকারি খাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টন। একই সময়ে সরকারি খাতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১৯ হাজার ৪৭৯ টন। অর্থাৎ সরকারি খাতে বাজার অংশীদারি মাত্র ১ শতাংশ। এ ছাড়া তিনটি বেসরকারি রিফাইনারিতে উৎপাদিত এলপিজিও বাজারে সরবরাহ করা হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি করে। এতে পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়। লোয়াব সভাপতি আমিরুল হক বলেন, বড় জাহাজে এলপিজি আমদানি করা গেলে টনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব। এতে ভোক্তারাও সরাসরি সুফল পাবেন। এ জন্য বেসরকারি খাতে টার্মিনাল স্থাপনে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে এমন সংকট আর হবে না।
লোয়াব সূত্র জানায়, সাধারণ সময়ে দেশে মাসে গড়ে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টন এলপিজির চাহিদা থাকে। শীতকাল ও রমজানে এই চাহিদা আরও আট হাজার থেকে ১০ হাজার টন বাড়ে। গত রমজানে চাহিদা ছিল প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার টন। এবার তা বেড়ে এক লাখ ৬০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে। এই বাস্তবতায় জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মিলিয়ে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার ঢাকার রেল ভবনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের এক জরুরি বৈঠকে এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এলপিজিকে শিল্প কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের ঋণ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত বাজারে সরবরাহ ও দামে কবে প্রভাব ফেলবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এলপিজি পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, কয়েকটি জাহাজ আসার খবর পাওয়া গেছে। দু-একদিন গেলে বোঝা যাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না।
এদিকে, গ্যাস সরবরাহে সাময়িক চাপের কথাও জানিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, শনিবার দুপুর ১২টা থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলবে। এ সময় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কম থাকবে। ফলে তিতাসের আওতাধীন আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকবে।

