বাংলাদেশ পুলিশের জন্য ক্যাম্প, ফাঁড়ি ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ৭০৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্প আজ রোববার একনেক সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্পের নাম হলো ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ফাঁড়ি/তদন্ত কেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ থানা ও আউটপোস্ট, ট্যুরিস্ট পুলিশ সেন্টার এবং হাইওয়ে পুলিশের জন্য থানা ও আউটপোস্ট নির্মাণ’। এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০৭ কোটি ৫৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। প্রকল্পে অর্থায়ন করবে সরকার। সূত্র বলেছে, দেশের আট বিভাগের ৪৮ জেলায় পুলিশের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনার মাধ্যমে আজ একনেকে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ জানান, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি পর্যালোচনা করা হয়েছে। যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুলিশের বর্ধিত জনবলের জন্য দাপ্তরিক ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত হবে। এর ফলে সারা দেশে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা জোরদার এবং বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিটগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় সারা দেশে থানাসহ পুলিশের ৪৬০টি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অস্ত্র, গুলি ও অন্যান্য সরঞ্জাম লুট হয়। পুলিশের মনোবল কমে যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি, ক্যাম্প, তদন্ত কেন্দ্র ও বিশেষায়িত পুলিশের স্থাপনা নির্মাণ, পূর্তকাজ, প্রকল্প দপ্তরের জন্য আসবাব ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়। এছাড়া ফাঁড়ি, ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও ইমিগ্রেশন পুলিশের জন্য আসবাব সরবরাহ করা হবে। পিডি অফিসের জন্য কম্পিউটার ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ক্রয় এবং বনায়ন ও ল্যান্ডস্কেপিং কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ পুলিশের বাস্তবায়নে প্রকল্পটি ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালানো হবে। দেশের ৮টি বিভাগের ৪৮টি জেলায় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ হবে।
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ পুলিশ ক্যাম্প, ফাঁড়ি ও তদন্ত কেন্দ্র অস্থায়ী স্থাপনায়, ভাড়া বাড়ি বা জরাজীর্ণ ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এতে জরুরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা, দ্রুত সেবা প্রদান এবং পুলিশ সদস্যদের আবাসিক সুবিধা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা, মহাসড়কে ছিনতাই ও ডাকাতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্থায়ী চেকপোস্ট ও অবকাঠামোর অভাবে তাদের কার্যকারিতা সীমিত। নৌপথে যাত্রী ও মালামালের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন ও নৌযান নিয়ন্ত্রণেও নৌ-পুলিশের ভূমিকা বেড়েছে। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। রেলপথে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিদ্যমান থানা ও ফাঁড়ির সংস্কার এবং নতুন স্থাপনা নির্মাণ প্রয়োজন। পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ট্যুরিস্ট পুলিশের জন্য আধুনিক ও পর্যাপ্ত সেন্টার না থাকায় সেবায় সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানালেন, মাঠে পুলিশ সদস্যরা সীমিত ও অস্থায়ী স্থাপনায় দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু জনবল ব্যবস্থাপনা নয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক সেবা প্রদানের সক্ষমতাও বাড়বে।

