জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেও গত দেড় বছরে দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন কোনো আশার সঞ্চার হয়নি। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বলছে, বিনিয়োগ সম্মেলনের ফল পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর গত বছরের ৭-১০ এপ্রিল বিডা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে। সম্মেলন ঘিরে দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে ব্যাপক শোরগোল পড়ে। ওই আন্তর্জাতিক সম্মেলন করতে অন্তর্বর্তী সরকারের খরচ মাত্র ৫ কোটি টাকা। তবে দেশের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে।
সম্মেলনে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব আসে। এরপর নতুন করে তেমন কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব আসেনি। বরং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশিবিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের হার কমে ৫৮ শতাংশে। বিডা বলছে, বিনিয়োগ সম্মেলনের ফল পেতে আরও অপেক্ষা করতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিল্পোদ্যোক্তা ও দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারীর মধ্যে এখন ভোটের প্রতীক্ষা রয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, কাতার, চীন, মালয়েশিয়া, তুরস্ক ও কোরিয়া সফর করেছেন। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র, ফেব্রুয়ারিতে জাপান, মার্চে যুক্তরাজ্য ও এপ্রিলে কাতারে (প্রধান উপদেষ্টার প্রতিনিধিদলে) সফর করেন। তবে কাতার থেকে কোনো বিনিয়োগ আসে না। যুক্তরাজ্য থেকে নিট এফডিআই কমেছে ৪০.৭১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা বিনিয়োগের চেয়ে বেশি প্রত্যাবাসিত হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপান ও যুক্তরাজ্য থেকে বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে। কাতার থেকে নতুন কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়নি। বিডার তথ্যমতে দেশের বেসরকারি খাতে ৬৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকার দেশিবিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫৮ শতাংশ কম। প্রস্তাবিত প্রকল্পের সংখ্যাও কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাতারাতি পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা না করে বরং বিনিয়োগ আকর্ষণের মূল প্রতিবন্ধকতা সমাধানে কাজ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ওয়ানস্টপ সার্ভিসের কথা কাগজে বহুবার বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর হয়নি। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটও কাটানো সম্ভব হয়নি। চলতি শীত মৌসুমেও লোডশেডিং চলছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫৫ লাখ কোটি টাকা। জিডিপির আকার ৫০-৫৫ লাখ কোটি হলেও দেশিবিদেশি বিনিয়োগের নিবন্ধন মাত্র এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার মধ্যে। মোট জিডিপির মাত্র ২-৩ শতাংশ। প্রকৃত বিনিয়োগ নিবন্ধনের অর্ধেক বা তারও কম আসে সেবাসংযোগ বিলম্ব, জ্বালানি সংকট ও লজিস্টিক প্রতিবন্ধকতার কারণে।
অযোগ্য সরকারি কর্মকর্তাদের খামখেয়াল, অনিয়ম-দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বেরোতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত হয়নি। বরং রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতিতে আস্থার সংকট আরও বেড়েছে। এফডিআই স্টক অনুযায়ী, চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ উৎস। প্রধান উপদেষ্টা চীনে সফর করেন গত বছরের মার্চে। পরের মাস এপ্রিলে বাংলাদেশে আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনে চীনা বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন। পরে নির্বাহী চেয়ারম্যান জুলাইয়ে চীনে সফর করেন। সাংহাইয়ে বাংলাদেশ-চায়না ইনভেস্টমেন্ট সেমিনারে চীনা বিনিয়োগকারীদের বিদ্যুৎ, টেক্সটাইল ও আইটি খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান। বিপুল আগ্রহ ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে চীনের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন ৮৯ শতাংশ কমে গেছে। নিট এফডিআই কমেছে ৩.৩ শতাংশ।
বিডা চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ‘কোনো দেশেই বিদেশি বিনিয়োগ রাতারাতি আসে না। বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সময় লাগে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। আমাদের করা বিনিয়োগ সম্মেলনের ফল পেতে আরও সময় দিতে হবে।’
দেশভিত্তিক বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও জার্মানি শীর্ষে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন ছাড়া কেউ শীর্ষ পাঁচে নেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৮২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। চীন থেকে ৬২০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪১০ কোটি, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৩১০ কোটি এবং হংকং থেকে ২২০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। চীনের প্রস্তাব আগের অর্থবছরের ৫ হাজার ৭৩০ কোটি থেকে কমেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিনিয়োগ প্রস্তাব কমে যাওয়া প্রত্যাশিত ছিল। বাংলাদেশ তখন রূপান্তরকালীন প্রক্রিয়ায় ছিল। বিনিয়োগকারীরা কোন ভরসায় আগ্রহ দেখাবে? দীর্ঘদিনের অবকাঠামো ও সুযোগ সমস্যা সমাধান হয়নি। তাই বিনিয়োগ কমেছে। নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব আসার পর পরিবেশ স্থিতিশীল হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নত হতে পারে।’

