দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিশ্চয়তা এবার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে। নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর মতো উদ্যোগ থেকে অনেক উদ্যোক্তা আপাতত সরে দাঁড়িয়েছেন। একই সময়ে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এই দুই বাস্তবতার সম্মিলিত প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে গত ৩৩ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। এর আগের মাস মে মাসে এই হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ঋণপ্রবাহ আরও কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ১৯৯৩ সালের পর এটাই সর্বনিম্ন ঋণপ্রবৃদ্ধি। চলতি বছরের মার্চ মাসেও প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা তখনই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণপ্রবৃদ্ধি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। সাধারণত যখন ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী থাকেন, তখন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়ে এবং ঋণপ্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বর্তমানে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতে, দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে নতুন ঝুঁকি নিতে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতি কার্যত এক ধরনের কঠিন সংকটময় সময় পার করছে। রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক শিল্পকারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। জুন মাসে তা কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে এলেও এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে, বাজারে চাহিদা দুর্বল হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণের ঝুঁকি নিতে অনেকেই রাজি হচ্ছেন না।
ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের অন্যতম সূচক আমদানি ঋণপত্র খোলার প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সাধারণত শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়। কিন্তু বর্তমানে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় এবং উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত থাকায় নতুন ঋণপত্র খোলার হারও অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত কয়েকটি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করে সেখানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু আর্থিক খাত নয়, জ্বালানি, শিল্প ও রপ্তানি—সব খাতে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
একই ধরনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান। তার মতে, বড় আকারের নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। পাশাপাশি আমদানি ঋণপত্র খোলার হারও কমে গেছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। মোট ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপির হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এত বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বড় শিল্পঋণের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট উদ্যোক্তাদের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতে ছোট অঙ্কের ঋণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কারণ এসব ঋণে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জুন মাসের প্রকৃত ঋণপ্রবৃদ্ধি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন সময়ের জন্য প্রথমে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। পরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতিতে জুনের লক্ষ্য কমিয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তব প্রবৃদ্ধি সেই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রারও নিচে অবস্থান করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই অর্থবছর ধরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। এর পেছনে রয়েছে ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতি, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, ব্যবসায়ীদের আস্থা হ্রাস, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মো. আক্তার হোসেন বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, শুধু ঋণপ্রবৃদ্ধি কমেছে বলেই সেটিকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একপর্যায়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। কিন্তু সেই সময়ের অনেক বড় ঋণ পরবর্তীতে অর্থ পাচার ও খেলাপি ঋণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে।
তার মতে, অতীতে দ্রুত ঋণ বিতরণ হলেও তার মান নিশ্চিত করা যায়নি। এখন ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার আগে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা ও ঝুঁকি অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করছে। কারণ বর্তমানে মোট ঋণের ৩০ শতাংশেরও বেশি খেলাপি হয়ে যাওয়ায় নতুন ঋণ আদায় নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই ঝুঁকির কারণে অনেক ব্যাংক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করছে। অন্যদিকে আর্থিকভাবে সক্ষম অনেক প্রতিষ্ঠানও বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন কারখানা স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদী যে সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তনের ইতিবাচক প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে। ঋণ গ্রহণকে উৎসাহিত করতে গত ৩০ জুলাই নীতিসুদ হার বা রেপো হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা ছয় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নীতিসুদ কমানোর সিদ্ধান্ত।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এসব উদ্যোগের ফলে আগামী মাসগুলোতে ব্যবসায়িক আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধিও আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ব্যাংক খাতের সংকট নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। যখন উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারান, তখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে যায়, শিল্প উৎপাদন কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপের মুখে পড়ে।
অন্যদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ব্যাংকগুলোর মূলধনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না, যা ভবিষ্যতের শিল্পায়ন ও রপ্তানি সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির উন্নতির জন্য শুধু সুদের হার কমানো যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে কার্যকর সহায়তা—এসব ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় ঋণপ্রবৃদ্ধি বাড়লেও তার কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্থনীতিতে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

