২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই চুক্তির লক্ষ্য হলো অধিকাংশ পণ্যের শুল্ক কমানো এবং সেবা, টেকসই উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলায় সহযোগিতা বাড়ানো। ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উর্সুলা ভন ডার লেয়েন এটিকে “মায়ের মতো বড় চুক্তি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তি নতুন ধরনের সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে। কারণ ভারত প্রায় শুল্কমুক্তভাবে ইইউর বাজারে প্রবেশ করতে পারবে, আর বাংলাদেশ তখনই তার প্রধান বাজারে প্রতিযোগিতার চাপের মুখোমুখি হবে। চুক্তি এখনও আইনি পর্যালোচনা, অনুবাদ এবং আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায়, তবে কৌশলগত দিক পরিষ্কার: ইউরোপ ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রিয় অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ইইউ প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং ভারত প্রায় ৯৬ শতাংশ পণ্যের উপর শুল্ক তুলে দেবে। বিশেষভাবে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইইউ ভারতীয় পণ্যের ৯০ শতাংশের শুল্ক তুলে দেবে, যা সাত বছরের মধ্যে ৯৩ শতাংশে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্র হলো বস্ত্র ও পোশাক শিল্প। ইইউ শুল্কমুক্ত করবে ভারতীয় বস্ত্র ও পোশাক, যেখানে আগে ৯ থেকে ১২ শতাংশ শুল্ক ছিল। একইভাবে চামড়া ও জুতা ক্ষেত্রেও শুল্ক কমানো হবে, যা আগে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।
এটি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সুবিধাজনিত শুল্ক পেয়েছে। ভারতের মতো বিশাল এবং সংহত শিল্প চেইন সম্পন্ন দেশ এখন সমান পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতা করতে পারবে, ফলে বাংলাদেশের বাজার শেয়ার কমানোর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রধান বাজার ইইউ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সমস্ত ইইউ রপ্তানির প্রায় ৯৪ শতাংশই বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের। সাম্প্রতিক অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৪ শতাংশই ইইউর কাছে গেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি নেই, বরং বড় সঞ্চয় আছে। কিন্তু ভারত যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, তাহলে ইইউর ক্রেতারা অর্ডার ভারতেও স্থানান্তর করতে পারে, যা বাংলাদেশের মুদ্রা আয়, শিল্প স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের সুবিধা মূলত “সকল অস্ত্র ব্যতীত সব” পরিকল্পনার উপর নির্ভর করে। তবে দেশের উন্নয়নশীল দেশ থেকে বের হওয়ার সময়সূচি ২০২৬ সালে, এবং এই সুবিধার উইন্ডো কার্যকরভাবে নভেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত।
এরপর, বাংলাদেশকে নতুন যোগ্যতা অর্জন করতে হবে বা পৃথক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে হবে, নাহলে পোশাকের শুল্ক প্রায় ১২ শতাংশে উঠে যাবে। ভারতের শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সংকটে পড়বে। সবচেয়ে সংবেদনশীল হবে সাধারণ পোশাক, যা মূলত মূল্য নির্ভরশীল এবং সহজে স্থানান্তরযোগ্য।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় হলো কেবল শুল্কের উপর নির্ভর করা নয়। ক্রেতারা এখন দ্রুত সরবরাহ, জটিল পণ্য এবং নির্ভরযোগ্য উৎপাদন চায়। বাংলাদেশের উচিত সাধারণ ফ্যাশন পণ্যের বাইরে গিয়ে ডিজাইন, উন্নত কৃত্রিম ফাইবারের পণ্য ও উচ্চমানের উৎপাদনে বিনিয়োগ করা।
তাছাড়া, ইইউর নতুন চুক্তি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, টেকসই উৎপাদন ও কঠোর মানদণ্ডে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই পরিবেশবান্ধব কারখানায় বিশ্বের শীর্ষে। এটি দেশের জন্য বড় সুবিধা হতে পারে।
চুক্তির কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি, বাংলাদেশ এবং ইইউ সম্পূর্ণ অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির পঞ্চম রাউন্ড শেষ করেছে। এই চুক্তি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি তৈরি করবে। বাংলাদেশের এখন সময় শক্তিশালী ও বহুমুখী পরিকল্পনা তৈরি করার। বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে হলে দেশের বাণিজ্যিক প্রস্তুতি, মানদণ্ড, উৎপাদন ক্ষমতা ও টেকসই শিল্পে বিনিয়োগ সমানভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
ইইউ-ভারত চুক্তি প্রমাণ করছে যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যিক অবস্থান পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার রপ্তানি সাফল্য তৈরি করেছিল সুবিধার ওপর নির্ভর করে। এবার আসল পরীক্ষা হবে সুবিধা ছাড়াই প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা। সময় এখনো আছে, তবে বার্তা পরিষ্কার: সুবিধার সময়সীমা খোলা হয়েছে, কিন্তু চিরকাল থাকবে না।

