জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়াকে ম্যানুয়াল থেকে অনলাইনে রূপান্তরিত করেছে। নতুন এই পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়ীরা ডিজিটালভাবে আবেদন করতে পারবে এবং সরাসরি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে রিফান্ড পাবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন; ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইন রিফান্ড এখন আগের ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক জটিল।
সংবাদমাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার ভ্যাট রিফান্ড কার্যত আটকে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নতুন পদ্ধতিতে আগের বকেয়া রিফান্ড পাওয়া যাচ্ছে না, আর নতুন আবেদন প্রক্রিয়ায় কেবল আংশিক রিফান্ডের সুযোগ রয়েছে।
ম্যানুয়াল বনাম অনলাইন:
আগের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অতিরিক্ত ভ্যাট, এসডি এবং অন্যান্য শুল্কের পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার আবেদন করা যেত। সময় লাগলেও ব্যবসায়ীরা তাদের পুরো পাওনা টাকা নিশ্চিতভাবে পেতেন। নতুন অনলাইন ব্যবস্থায় আবেদন প্রক্রিয়ায় অডিটসহ বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যার ফলে রিফান্ড পাওয়া আরও কঠিন হয়ে গেছে।
বড় প্রতিষ্ঠানও সমস্যায়:
কনফিডেন্স গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৪০ কোটি টাকার রিফান্ড তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনলাইন পদ্ধতিতে তারা কেবল ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ফেরতের জন্য আবেদন করতে পারছেন; ১৫ শতাংশ ভ্যাট বা সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ফেরতের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, “হিসাব করলে রিফান্ড হিসেবে আমার পাওনা ৪০ টাকা, নতুন পদ্ধতিতে সরকার দিচ্ছে মাত্র দুই টাকা।”
মেঘনা গ্রুপের একটি বিভাগের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন অনলাইন পদ্ধতিতে আগের সমস্ত বকেয়া বাদ দিয়ে পুনরায় আবেদন করতে হচ্ছে। তবে অ্যাডভান্স ট্যাক্স ছাড়া অন্য কোনো ভ্যাটের অর্থ ক্লেইম করা যাচ্ছে না। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী আগে রিফান্ডের জন্য অডিট বাধ্যতামূলক ছিল না; নতুন পদ্ধতিতে অডিট এবং আরও কঠিন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
কমিশনারেট পর্যায়েও আটকে আছে কোটি কোটি টাকা:
ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২১১ কোটি টাকার রিফান্ড ক্লেইম জমা রয়েছে। নতুন নিয়মে এসব প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনে আবার আবেদন করতে হবে, তবে আংশিক রিফান্ডের সুযোগই সীমিত।
একজন কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নতুন ব্যবস্থায় কেন কেবল আংশিক রিফান্ড দেওয়া হচ্ছে, সে ব্যাখ্যা এনবিআরই দিতে পারবে।” এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান গত ২৫ নভেম্বর জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে প্রক্রিয়াটি সহজ করা হবে। তবে ভ্যাট ও এসডির রিফান্ড নতুন পদ্ধতিতে দেয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, নতুন প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে ২৪টি চেকলিস্ট অনুসরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রিফান্ড পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “সরকারের কাছে পাওনা থাকলেও সুবিধা পাচ্ছি না, নতুন ব্যবস্থা ‘মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা’ ছাড়া আর কিছু নয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাট রিফান্ড আইনগতভাবে এনবিআরের দায়িত্ব। কিন্তু সঠিক সমাধানের বদলে জটিল নিয়ম আর চেকলিস্টের মধ্যে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

