বছর পাল্টালেও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা যেন পিছু ছাড়ছে না। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই অস্থিরতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আগের সব পূর্বাভাস ছাপিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা একদিকে বিনিয়োগকারীদের নজর কেড়েছে, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণকে প্রায় অধরা করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যতদিন চলবে, ততদিন স্বর্ণের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে—এমন আশা করা কঠিন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তের পর স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামের বাজারে স্বল্প সময়ের জন্য দরপতন দেখা গেছে, তবে তা বাজারের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা কমাতে পারেনি।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ধাপে ধাপে বেড়েছে স্বর্ণের দাম। একের পর এক রেকর্ড ভেঙে তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। দেশে স্বর্ণের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে এই মূল্যবান ধাতু।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, এই ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ লুকিয়ে আছে বিশ্বজুড়ে চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার ভেতরে। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা স্বর্ণের বাজারকে উত্তপ্ত করে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের রেশ এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বিশ্ব রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে স্বর্ণের মতো নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সরবরাহ সেই হারে বাড়ছে না—যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দামে।
স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে কেবল যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকটই নয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বড় ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি, ডলারের দরের ওঠানামা এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলেছে।
শেয়ারবাজার বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতের তুলনায় স্বর্ণকে এখন সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ বাড়াচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর বাজারে অস্থিরতার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিটি কারণই কোনো না কোনোভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
গত সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলারের সীমা অতিক্রম করে এবং স্বল্প সময়ের জন্য প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়। একই সময়ে রুপা ও প্লাটিনামের দামও বেড়ে যায়।
এর রেশ বাংলাদেশেও লাগে। গত বৃহস্পতিবার দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা, যা ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে পরবর্তী দুই দিনে দুই দফায় ভরিপ্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা কমে আসে দাম।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আভাস মিললে মূল্যবান ধাতুর দাম তুলনামূলক দ্রুত কমে আসে। কিন্তু ট্রাম্প যেসব দেশকে বাণিজ্যিকভাবে অনুকূল মনে করেন না, তাদের পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
যুক্তরাজ্যের আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হারগ্রিভস ল্যান্সডাউনের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ এমা ওয়ালের মতে, ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বিনিয়োগকারীদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। এই উদ্বেগই স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যত অস্থির হয়, স্বর্ণ তত বেশি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বাণিজ্যিক উত্তেজনা, ভূরাজনৈতিক বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণমুখী করছে।
এমা ওয়াল আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণ কেনাও দামের ঊর্ধ্বগতির বড় কারণ। অনেক দেশ ধীরে ধীরে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বর্ণকে রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার ডলারভিত্তিক সম্পদ জব্দ হওয়ার অভিজ্ঞতা অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক করেছে। ফলে তুলনামূলক নিরপেক্ষ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ, চীন ও কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করছে। এতে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছেন।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, ডলার দুর্বল হলে সাধারণত স্বর্ণের দাম বাড়ে। কারণ তখন অন্যান্য মুদ্রাধারীদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সূচক কমার সঙ্গেও স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বগতি মিলেছে। একই কারণে রুপা ও প্লাটিনামেও বিনিয়োগ বেড়েছে।
তবে এই ঊর্ধ্বগতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও পরে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল হিসেবে পরিচিত কেভিন ওয়ার্শকে মনোনয়নের খবরে বাজার কিছুটা স্বস্তি পায়। এর পরপরই স্বর্ণ, রুপা ও প্লাটিনামের দামে হঠাৎ পতন দেখা যায়।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দরপতন সাময়িক। চলমান যুদ্ধ, সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধ, নতুন শুল্ক আরোপ এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ঘিরে অনিশ্চয়তা স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা বজায় রাখবে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের আবেদন এখনো কমেনি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের নীতি ও বক্তব্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেই নয়, বিশ্ব বাণিজ্য ও পণ্যের বাজারেও গভীর প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দামের নাটকীয় ওঠানামা সেই বাস্তবতারই স্পষ্ট প্রতিফলন।

