বৈশ্বিক চিংড়ির বাজারে বর্তমানে ৬০-৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ভেনামি প্রজাতির চিংড়ি। উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ও দ্রুত বর্ধনশীল এই প্রজাতির চাষ নিয়ে বাংলাদেশে সাত-আট বছর ধরে গবেষণা চালানো হয়েছে। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২২ সালে সরকার বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমোদন দেয়। রফতানি আয়ের সম্ভাবনা দেখে উদ্যোক্তারা এ খাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। তারা আশা করেছিলেন, এ শিল্প দ্রুত সম্প্রসারণ করবে।
তবে হঠাৎ করেই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বিশেষ জাতের চিংড়ি চাষে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এ সিদ্ধান্তে ভেনামি চাষিরা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবে দেশের চিংড়ি পোনা এখনো মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল। যদিও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে পোনা উৎপাদন শুরু করেছে, তা মানে আন্তর্জাতিক মান পূরণে ব্যর্থ। তবুও সরকার কোনো আলোচনার আগে পোনা আমদানি নিষিদ্ধ ও চাষ সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এর ফলে দেশের চিংড়ি বাজারের অংশ ভারতের হাতে চলে যাচ্ছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভেনামি চাষের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এজন্য এখনই চাষ সম্প্রসারণ করা সমীচীন নয়। মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে চিংড়ি রফতানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সী মার্ক গ্রুপের কর্ণধার, ব্রিটিশ-বাংলাদেশী উদ্যোক্তা ইকবাল আহমেদ ওবিই। তিনি বলেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত ভুল ও আত্মঘাতী। আমাদের দেশে ভেনামি চাষ শুরু করার জন্য গত কয়েক বছর প্রচেষ্টা ও শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগও আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এখন চাষে বাধা দেওয়া দেশের স্বার্থবিরুদ্ধ।’
সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তর ভারত থেকে ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির নপলি (ডিম থেকে ফোটার পর প্রথম জীবনচক্র) আমদানির অনুমতি দিয়েছিল। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। দেশীয় হ্যাচারিগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে আমদানির অনুমতি বাতিলের দাবি জানিয়েছিল। ১৪ জানুয়ারি শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সেব) সভাপতি লুৎফর রহমান কাজল সংবাদ সম্মেলনে এ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। পরদিনই সরকার ভেনামি চিংড়ি আমদানি বন্ধের নির্দেশনা জারি করে।
১৫ জানুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ভেনামি চিংড়ি আমদানিনির্ভর। এর পোনা আমদানির মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ, পরিবেশ দূষণ এবং দেশীয় বাগদা ও গলদা প্রজাতির ওপর নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য চাষ সম্প্রসারণের পূর্বে প্রভাব বিশ্লেষণ প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘ভেনামির বৈশ্বিক বাজারের অংশ ৬০-৭০ শতাংশ। বাংলাদেশি অংশ খুব নগণ্য। ভেনামি চাষের মাধ্যমে রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। পোনা আমদানির বন্ধে চাষ ও রফতানি পিছিয়ে যাবে।’ অন্য উদ্যোক্তা শ্যামল দাস বলেন, ‘পাঁচ বছর গবেষণা করার পর আবার কেন নতুন গবেষণার প্রয়োজন? তারা কেন খাত সম্প্রসারণে বাধা দিতে চায়?’
২০২১ সালে খুলনার পাইকগাছায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে ছয়টি পুকুরে পরীক্ষামূলক ভেনামি চাষে ৭ লাখ ৬২ হাজার পিএল (পোস্ট লার্ভা) ছাড়ার পর ৫ লাখ ৯৮ হাজার চিংড়ি আহরণ করা হয়। উৎপাদন ছিল ১৩,৮৯৬ কেজি। বিক্রয়মূল্য ৬৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। খরচ ধরা হয়েছিল ৫৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এতে ১৫ লাখ ৭১ হাজার লাভ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনামি চিংড়ি ঘনত্বে চাষ করা যায় এবং ৯০-১২০ দিনে চূড়ান্ত ফসল পাওয়া সম্ভব।
উদ্যোক্তারা জানান, ভারতের ১২ বছর পরে বাংলাদেশে ভেনামি চাষ শুরু হয়েছে। আধুনিক পদ্ধতিতে হেক্টর প্রতি উৎপাদন ৮-২০ টন। বাংলাদেশে গলদা ও বাগদার উৎপাদন যথাক্রমে ০.৫২ টন ও ০.৩৩ টন। ভারতের সামুদ্রিক পণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতের হেক্টর প্রতি উৎপাদন বাংলাদেশের চেয়ে ১৪ গুণ বেশি। ইন্দোনেশিয়ায় ৩.৬ টন, ভিয়েতনামে ১.৪৭ টন।
ডব্লিউআইটিএস তথ্য দেখায়, ২০০৮ সালে ভারতে ভেনামি চাষের অনুমোদনের পর ২০১০ সালে রফতানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। ২০২৪ সালে আয় হয়েছে ৪২৯ কোটি ডলার। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায়ও একই ধারা। বাংলাদেশের অবস্থান বিপরীত: ২০০০ সালে চিংড়ি রফতানি আয় ৫১ কোটি ডলার থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ২৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলারে নেমেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের বলেন, ‘স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার পর কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আমার হাতে সব ডকুমেন্ট নেই, তাই অফিসে না গিয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।’

