ঢাকার অদূরে আশুগঞ্জ–পলাশ এলাকায় পাঁচ বছর বন্ধ থাকার পর সেচ কার্যক্রম পুনরায় চালু হচ্ছে। এর ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদীর সাতটি উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা ফিরবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সরকার এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, দেশের খাদ্যশস্য ঘাটতি কমানো এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর উদ্যোগে, যার নামকরণ করা হয়েছে ‘আশুগঞ্জ-পলাশ সবুজ প্রকল্প’। ইতোমধ্যে এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি শুরু হয়েছে চলতি বছর এবং শেষ হবে ২০২৯ সালের জুনে।
বিস্তারিত পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, সেচের পানি সরবরাহ করা হবে একটি ভিন্ন পদ্ধতিতে। এ ক্ষেত্রে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হবে না। বরং আশুগঞ্জ ও ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং কাজে ব্যবহৃত গরম পানি ঠান্ডা করে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আশুগঞ্জ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১১০০ কিউসেক এবং ঘোড়াশাল কেন্দ্র থেকে ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করা হবে। এতে প্রায় ২১ হাজার হেক্টর জমিতে নিয়মিত সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রকল্পটি সফল হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহৃত পানি পুনর্ব্যবহার করে সেচ দেওয়া পরিবেশবান্ধব এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ। তবে এর জন্য পরিবেশগত ঝুঁকি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।”
প্রকল্পের কার্যক্রমকে গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “এই প্রকল্প কৃষকদের জন্য কষ্ট কমাবে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করবে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক হবে।”
প্রকল্পের আগে আশুগঞ্জ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং রিজার্ভার ভরাট এবং আশুগঞ্জ-সরাইল-আখাউড়া মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত করার সময় সেচ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর ফলে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে সেচ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বোরোসহ অন্যান্য মৌসুমে কৃষকের চাষাবাদ ব্যাহত হয় এবং অনেক জমি অনাবাদিও হয়ে পড়ে।
নতুন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে একটি বড় কুলিং রিজার্ভার, ১৮ কিলোমিটার কংক্রিট ক্যানেল, ৩.৪ কিলোমিটার ক্লোজড কনডুইট, ১৩টি রেগুলেটর, সাইফুন, রিটেইনিং ওয়ালসহ বিভিন্ন জলকাঠামো। এছাড়া ৫৫ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন, ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন সম্প্রসারণ এবং নতুন এলএলপি স্কিম স্থাপন করা হবে। এতে আধুনিক ও টেকসই সেচ ব্যবস্থা গড়ে উঠার আশা করা হচ্ছে।
যদিও সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হচ্ছে, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গরম পানি ব্যবহার করা হলে পরিবেশগত প্রভাব যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। একনেক সভায় পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ছাড়পত্র প্রদানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, “প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু সেচ সুবিধা নয়, স্থানীয় কৃষকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।”
স্থানীয় কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, “সেচ বন্ধ থাকার কারণে অনেক বছর ধরে ঠিকমতো চাষ করতে পারছি না। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আগের মতো ফলন পাবো বলে আশা করছি।”

