অর্থনীতির গতি এখনো মন্থর। ভোগব্যয় কমেছে। বিনিয়োগে রয়েছে স্থবিরতা। তবু চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তামাক ও বেভারেজ খাত থেকে ভ্যাট আদায়ে চোখে পড়ার মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) আওতাধীন এই দুটি খাত রাজস্ব আদায়ে এগিয়ে থাকলেও, সামগ্রিক চিত্রে অর্থনীতির চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের ভ্যাট আদায় আগের অর্থবছর ২০২৪–২৫-এর একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করে হিসাব করা হয়েছে। ওই সময় দেশে গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম ছিল। ফলে এবারের প্রবৃদ্ধি সংখ্যাগতভাবে বড় হলেও, এর পেছনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক ও বেভারেজ খাতে ভ্যাট আদায়ের এই উল্লম্ফনের প্রধান কারণ ‘লো বেস ইফেক্ট’। আগের অর্থবছরে এসব খাতে রাজস্ব আদায় কম থাকায় স্বাভাবিক অর্থনৈতিক গতিতেই এবছর প্রবৃদ্ধি বেশি দেখানোর কথা ছিল। কিন্তু সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো দুর্বল থাকায় প্রকৃত অর্থে প্রবৃদ্ধির গতি খুব একটা শক্তিশালী নয়।
এর বিপরীতে ব্যাংকিং খাত, মোবাইল ফোন কোম্পানি, কিছু নির্মাণসামগ্রী এবং ভোক্তা পণ্য খাতে ভ্যাট আদায়ের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষ করে সিমেন্ট খাতে রাজস্ব আদায় বাড়েনি; বরং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। যা নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্যবসায়ী মহল বলছে, বাজারে আস্থা ফেরেনি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। নীতিগত নিশ্চয়তা ছাড়া উৎপাদন ও ভোগব্যয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সব মিলিয়ে, তামাক ও বেভারেজ খাতে ভ্যাট আদায়ের উত্থান আলাদা করে নজর কাড়লেও, অন্যান্য খাতের দুর্বল পারফরম্যান্স বলছে—অর্থনীতির গতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক ধারায় ফেরেনি।
এলটিইউ-ভ্যাটের আয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট বা লার্জ ট্যাক্সপেয়ার্স ইউনিট–ভ্যাট (এলটিইউ-ভ্যাট) অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই ইউনিটের আওতায় থাকা ১০৯টি কোম্পানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি ভ্যাট প্রদান করেছে।
এনবিআরের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে দেশের মোট ভ্যাট আদায় প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০৯টি কোম্পানির কাছ থেকে এসেছে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট ভ্যাট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি। অপ্রত্যাশিতভাবে এর অর্ধেকেরও বেশি রাজস্ব এসেছে শুধুমাত্র তিনটি সিগারেট কোম্পানি থেকে—যার মধ্যে প্রধানভাবে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রেখেছে। এলটিইউ-ভ্যাটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সিগারেট খাত থেকে ভ্যাট আদায় হয়েছে ২১ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। এটি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা বা ৪৭ শতাংশ বেশি।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৫ সালের শুরুতে তামাকজাত পণ্যের দাম ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়। একই সঙ্গে কিছু নীতিগত পরিবর্তন কার্যকর করা হয়েছিল। এর ফলে বছরের শুরু থেকেই তামাক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত ভ্যাট ও শুল্ক আদায় হয়েছে। সদৃশ কারণে বেভারেজ খাতে ভ্যাট বৃদ্ধিও হয়েছে, তিনি জানান।
এ বিষয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের এক মুখপাত্র তামাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সিটিজেনস ভয়েসকে বলেন, ‘২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী বাজেটে হঠাৎ আবগারি শুল্ক বাড়ানোর ফলে তামাক খাতের কার্যকর করভার আগের ৭৬ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বৈধ সিগারেট উৎপাদনকারীদের প্রাপ্য নিট আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাঝে এক-দুই বছরের ব্যতিক্রম ছাড়া বিগত সময়ে তামাক খাত থেকে সাধারণত প্রতি বছর দুই অঙ্কের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধির হার নেমে এসেছে মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশে।’
তবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে বিএটির সিগারেট বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয়, বিক্রি কমার পরও ভ্যাট আদায় উল্টো বেড়েছে। এই চিত্র স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে—রাজস্ব বৃদ্ধিতে শুধু বিক্রির পরিমাণ নয়, দাম, সম্পূরক শুল্ক এবং নীতিগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফার্মাসিউটিক্যালস ২৩% এবং বেভারেজ ৩৪% ভ্যাট বৃদ্ধি পেয়েছে:
এলটিইউ-ভ্যাটের হিসাব অনুযায়ী, তামাক খাতের পরে ভ্যাট প্রদানে শীর্ষে রয়েছে কয়েকটি বড় খাত। এর মধ্যে আছে ৪টি মোবাইল ফোন কোম্পানি, ৫টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি, ১৮টি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি, ১৭টি ব্যাংক, বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান, একটি সাবান কোম্পানি, ওয়াটার সাপ্লাই, প্রিন্ট ও ভার্নিশ এবং ৯টি সিমেন্ট কোম্পানি। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে বেভারেজ খাতের ৪টি কোম্পানির কাছ থেকে ভ্যাট আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ফার্মাসিউটিক্যালস খাত থেকে ভ্যাট আদায় বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই)-এর সেক্রেটারি জেনারেল মো. জাকির হোসেন জানান, জুলাই থেকে ডিসেম্বরের সময় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর গ্রোথ সাধারণত বেশি থাকে। “এটি স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি,” তিনি বলেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আগামি মাসগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির হার আগের মতো থাকবে না। এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, তামাকের মতো উচ্চ রাজস্ব খাতের পাশাপাশি মোবাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেভারেজ খাতও দেশের ভ্যাট আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিমেন্ট খাতের রাজস্ব কমেছে ২০ শতাংশ:
যেসব খাতে তুলনামূলকভাবে ভ্যাট প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা তা অর্থনীতির মন্থর গতিকে দায়ী করছেন। সিমেন্ট খাতের ক্ষেত্রে গত দেড় বছর ধরে প্রবৃদ্ধি কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে এই খাত থেকে ভ্যাট আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শহীদুল্লাহ চাহিদা কমে যাওয়াকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখান। তিনি বলেন, “গত দুই বছর ধরে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম খুবই ধীরগতিতে চলছে। এর প্রভাব পড়েছে সিমেন্ট ও স্টিল পণ্যের চাহিদায়। এ কারণেই নেগেটিভ গ্রোথ দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে গতি ফিরে আসতে পারে। তবে আগামী ছয় মাসে তেমন কোনো পরিবর্তন আশা করা যাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি সম্ভবত পরবর্তী অর্থবছরে ফিরে আসবে।” এই চিত্রে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থবিরতা সরাসরি রাজস্ব প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করছে।
ব্যাংক খাতের ভ্যাট আয়ে বৃদ্ধির হার ৩.৪৬%:
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ব্যাংক খাত থেকে ভ্যাট আদায় মাত্র ৩.৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, “কয়েকটি ব্যাংকের সেবা কার্যক্রম স্থগিত ছিল এবং আমানত কমে যাওয়ায় এই কম প্রবৃদ্ধির অবস্থা তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “কয়েকটি ব্যাংক ভালো পারফর্ম করেছে, তবে বেশিরভাগ ব্যাংকের অবস্থার উন্নতি হয়নি। দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ একটি সুসংগঠিত নির্বাচন ও সুশৃঙ্খল ট্রানজিশনের ওপর নির্ভর করছে। অর্থনীতিতে গতি ফিরে এলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।”
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ডিরেক্টর স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, “চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি আগের অর্থবছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। যেহেতু আগের বছর ভ্যাট আদায় কম ছিল, স্বাভাবিক অর্থনৈতিক গতি থাকলে এবার প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ার কথা ছিল।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “কিছু খাতে আশা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি না হওয়া মানে অর্থনীতির গতিমন্ধতা এখনো কাটেনি। আবার অন্য কিছু খাতে প্রবৃদ্ধির মূল কারণ হলো নতুন কর বৃদ্ধি ও নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব।”

