বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৪.৭ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। শুধু তাই নয়, আগামী অর্থবছরেও এই পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে না সংস্থাটি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক ও রাজস্ব সংস্কারে দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন এক ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়েছে বলে মনে করছে আইএমএফ।
শনিবার প্রকাশিত আইএমএফের এই পর্যবেক্ষণ এসেছে সংস্থাটির দীর্ঘদিনের একটি ‘স্টাফ মিশন’ ও আর্টিকেল–৪ পর্যালোচনা শেষে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে আরও বড় আর্থিক ও রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এমনকি ‘সার্বভৌম ঋণ সংকট’-এর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আইএমএফ বলছে, কঠোর মুদ্রানীতি, আর্থিক খাতের চাপে বিনিয়োগের দুর্বলতা, নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক—সব মিলিয়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশেই আটকে থাকতে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক এই সংস্থার মতে, এসব বাধা কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর মতো অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন সমস্যাগুলো নিয়েও কড়া সতর্কতা দিয়েছে আইএমএফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধান না হলে ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত হবে, বিনিয়োগ কমবে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে অতিরিক্ত তারল্য সহায়তা দিলে স্বল্পমেয়াদে সুদের হার কৃত্রিমভাবে কমে যেতে পারে, বিনিময় হার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে এবং মূলধন দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়বে। এর ফল হতে পারে দ্রুত মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ।
আইএমএফ আরও বলছে, আর্থিক ও ব্যাংকিং সংস্কার বিলম্বিত হলে প্রবৃদ্ধি কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে অস্থিরতা আরও গভীর হবে। এমনকি ২০২৬–২৭ অর্থবছরেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার খুব একটা বদলাবে না বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। কারণ, নিকট ভবিষ্যতেও মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার ওপরে থাকার আশঙ্কা রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে দেরি হলে ঝুঁকি আরও বাড়বে।
রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা ও বড় অঙ্কের ভর্তুকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজস্ব আয় ধারাবাহিকভাবে কম থাকলে এবং ভর্তুকির চাপ না কমালে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক খাতে ব্যয় সংকুচিত হয়ে পড়বে। যদিও ঋণ টেকসই রাখতে সরকার যদি প্রাথমিক ঘাটতির বর্তমান পথ ধরে রাখে, তবুও এই চাপ থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হবে।
আইএমএফের ‘বেসলাইন পরিস্থিতি’ ধরে নেওয়া হয়েছে, সরকার যদি দ্রুত ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়—তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যাট সংস্কার, ন্যূনতম টার্নওভার করের হার বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও সংস্কারে দৃঢ় পদক্ষেপ।
ব্যাংক খাত নিয়ে আইএমএফের স্টাফ রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, বহুপাক্ষিক ঋণসহ বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি সরকারি ঋণ ধারণের সক্ষমতাও কমিয়ে দেবে, যার ফলে সরকারি ঋণের খরচ আরও বাড়তে পারে।
আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, এই নেতিবাচক চক্র অব্যাহত থাকলে মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বৈদেশিক সুরক্ষা বলয় দুর্বল হবে এবং এতে মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হার—দু’টিই চাপে পড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে প্রবৃদ্ধি ও সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৯ শতাংশেই থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে যদি সময়ের আগেই নীতিতে শিথিলতা না আসে এবং নতুন কোনো সরবরাহ সংকট তৈরি না হয়, তাহলে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৬.০ শতাংশে নামতে পারে।
বাংলাদেশকে দেওয়া ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে আইএমএফ বলছে, এই নীতিপ্যাকেজ বাস্তবায়ন করা জরুরি—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে, মধ্যমেয়াদে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই রাখতে।
সংস্থাটি আবারও উচ্চ সরকারি ঋণ পরিশোধ ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে এবং বলেছে, এতে ‘সার্বভৌম ঋণ সংকট’-এর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এ জন্য প্রয়োজন আরও কঠোর ও সমন্বিত নীতিমালা। পাশাপাশি অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়, সংস্কার থেকে সরে আসা কিংবা বিনিময় হার সংস্কার উল্টো পথে গেলে ঝুঁকি আরও তীব্র হবে বলে মনে করছে আইএমএফ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনও লক্ষ্যমাত্রার ওপরে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগগুলো এখনো প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না, আর ভর্তুকি সংস্কারে দেরির কারণে সরকারের আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে ব্যাপক মূলধন ঘাটতির কারণে ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
আইএমএফের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—রাজস্ব আদায়ে জোরালো সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, ভর্তুকি হ্রাস এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক জায়গা তৈরি করা। ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য কৌশল, স্পষ্ট আর্থিক সহায়তার কাঠামো এবং আইনি ভিত্তি মজবুত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি মনে করে, সুস্থ ও সুশাসিত ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নিয়ম শিথিল করে নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই এগোতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম রিজার্ভের মতো স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলায় কঠোর মুদ্রানীতি ও নতুন বিনিময় হার ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য আইএমএফ সুশাসন জোরদার, স্বচ্ছতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অর্থায়ন জোরদার করাও জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।
আইএমএফের মতে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্য পুনর্গঠন আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং ঋণ সংকট কিছুটা হলেও কাটবে। পাশাপাশি রাজস্ব সংস্কার থেকে তৈরি অতিরিক্ত জায়গা সামাজিক ব্যয় ও সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে। এলডিসি উত্তরণের পথে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনের পরও সংস্কারের গতি ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

