মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারে বাংলাদেশকে অনেকটাই ডিজিটাল দেশ বলা হয়। শহর-গ্রাম, অফিস-পাড়া, বাজার—সবখানেই হাতে হাতে স্মার্টফোন আর মোবাইল আর্থিক সেবার লোগো। কিন্তু এই দৃশ্যমান ডিজিটাল অগ্রগতির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বড় বৈপরীত্য। দেশের মানুষের বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক সঞ্চয় ও ঋণের বাইরে।
বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেইস ২০২৫’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে সঞ্চয় করেন, আর মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন। অন্য কথায়, দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ এখনও বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে।
তথ্য আরও বলছে, দেশের ৮২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে, আর ৪৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক হলেও, সেই প্রযুক্তি সঞ্চয় বা ঋণের মতো মৌলিক আর্থিক সেবায় মানুষের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
দেশে মাত্র ৪৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কোনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক হিসাব আছে। হিসাব থাকা সত্ত্বেও ডিজিটাল লেনদেনে সক্রিয় মানুষের হার মাত্র ৩৪ শতাংশ, অর্থাৎ হাতে মোবাইল ও ইন্টারনেট থাকা সত্ত্বেও অনেকেই নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেন করছেন না।
সঞ্চয় যেখানে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভিত্তি, সেখানে দেশের মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে সঞ্চয় করেন। বাকি মানুষ হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে টাকা জমিয়ে রাখেন, অথবা সঞ্চয়ই করেন না। ঋণের ক্ষেত্রেও চিত্র প্রায় একই—মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নেন।
ফলে প্রয়োজনের সময় অধিকাংশ মানুষকে নির্ভর করতে হয় আত্মীয়-স্বজন, মহাজন বা অনানুষ্ঠানিক ধারদেনার ওপর, যেখানে সুদ, শর্ত ও ঝুঁকি অনেক বেশি।
প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ অনেকটা পিছিয়ে। উদাহরণস্বরূপ:
-
চীনে ৬৭ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিকভাবে সঞ্চয় করেন, থাইল্যান্ডে ৫৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৫২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৪৫ শতাংশ।
-
ভারতে এই হার ২৭ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
ঋণের ক্ষেত্রেও চীনে ৪১ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নেন, যেখানে বাংলাদেশ অনেক পেছনে।
ডিজিটাল লেনদেনের দিক থেকেও বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে। যেখানে চীনে ৮৯ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করেন, থাইল্যান্ডে ৮৩ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৭৭ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৩৪ শতাংশ। প্রতিবেশী নেপাল ও পাকিস্তান কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও, দক্ষিণ এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্টভাবে দুর্বল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে:
- আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার প্রতি আস্থার ঘাটতি এখনো কাটেনি।
- গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যাংকিং সেবা জটিল ও ব্যয়বহুল।
- নারী ও কম আয়ের মানুষের ডিজিটাল আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের অর্ধেকেরও কম ডিজিটাল লেনদেন করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে হার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে শুধু প্রযুক্তি নয়, আন্তরিক প্রচেষ্টা, সহজ আর সাশ্রয়ী ব্যাংকিং সেবা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়ের জন্য কাস্টমাইজড আর্থিক প্যাকেজ প্রয়োজন।
বাংলাদেশকে সত্যিকারের ‘ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল নেশন’ হিসেবে গ

