বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ৩৫টি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) পর্যালোচনা করে ২০টিকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাকী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুইটিকে তিন মাস এবং একটি প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায় বা প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের অবসায়ন প্রক্রিয়া থেকে বাঁচানো হতে পারে। অন্যথায়, নির্ধারিত সময় শেষে তাদের বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ পদক্ষেপে দেশের আর্থিক সিস্টেমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ঋণ খেলাপিদের কারণে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র:
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৫টি এনবিএফআইয়ের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৮৩.১৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এত উচ্চ খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ধকী সম্পদের মোট মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা খেলাপি ঋণের তুলনায় অনেক কম। ফলে ঋণ আদায়ে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের মুখোমুখি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি দেশের এনবিএফআই খাতের দুর্বল দিকগুলো আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করছে।
তিন প্রতিষ্ঠানকে ছয় মাসের সময়:
অনিয়ম, দুর্নীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের সময় দেওয়া হয়েছে পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
- বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি
- জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি
- প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে অবলুপ্ত করা হবে। বাকি তিনটি প্রতিষ্ঠান সময় চেয়েছে, তাই তাদেরকে তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে নিজ নিজ সমস্যার সমাধান ও ঋণ আদায়ে অগ্রগতি দেখাতে হবে। যদি এ সময়ে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হয়, তবে তাদেরও অবসায়নের আওতায় আনা হবে।
গভর্নর আরও জানিয়েছেন, অবসায়নের আওতায় যেসব প্রতিষ্ঠান পড়বে, সেখানে আমানতকারীরা শুধুমাত্র মূল আমানতের টাকা পাবেন। কোনো সুদ বা মুনাফা দেওয়া হবে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আগে কিছু এনবিএফআইয়ে আমানতকারীরা মাত্র ১৮ টাকা ফেরত পেয়েই সন্তুষ্ট হয়েছেন, যেখানে পূর্বে কিছুই ফেরত পাননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি কমানো।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যত ‘মরে গেছে’, সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা ফলপ্রসূ নয়। বরং এখনো টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে স্থিতিশীল রাখা যায় সেই দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।
তারা বলেন, একীভূতকরণ বা মার্জিংয়ের আগে দেখা জরুরি, দুর্বল প্রতিষ্ঠানটি আদৌ ভালো প্রতিষ্ঠানের প্রভাবে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো ‘ক্যান্সার’ বা ‘গ্যাংগ্রিন’-এর মতো অবস্থা পৌঁছে গেছে, যেখানে জোর করে বাঁচানোর চেষ্টা ফলপ্রসূ হয় না।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, কিছু প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করে বাঁচানো সম্ভব হলেও সব প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করতে গেলে সরকারের বিপুল অর্থায়ন ও সহায়তা প্রয়োজন, যা বর্তমানে সম্ভব নয়।
তিন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ:
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হবে।
তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৭.৩১ শতাংশ। গত বছর এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে ১৪৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে এবং তাদের মোট মূলধন উদ্বৃত্ত ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোই বর্তমানে দেশের এনবিএফআই খাতের স্থিতিশীলতার প্রধান ভরসা।

