আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এই ইশতেহারে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শ্লোগানকে সামনে রেখে দলটি ঘোষণা করেছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আধুনিক উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠীর সুবিধার পরিবর্তে দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তি এবং অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। বিএনপি আশা করছে, কেবল ক্ষমতা পরিচালনা নয়, বরং পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিতরণ ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি:
ইশতেহারে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’-এর ওপর। বলা হয়েছে, মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার পরিবর্তে প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। দেশের বিদ্যমান ‘অলিগার্কিক কাঠামো’ ভেঙে সম্পদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা হবে এবং বাজারের সব পর্যায়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হবে।
মধ্যবিত্তের ভিত্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মানসম্মত আবাসন, শিক্ষা এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। দলটি আশা করছে, কেবল ক্ষমতা পরিচালনা নয়, বরং পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগ উৎসাহিতকরণ ও এফডিআই নেতৃত্ব স্থাপন:
ইশতেহারে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, এফডিআইকে জিডিপির ২.৫ শতাংশে উন্নীত করা। বিনিয়োগকারীদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-তে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ এবং ২৪/৭ সচল হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হবে।
এছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য ‘এফডিআই ক্যাপ্টেন’ নিয়োগ এবং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট সহজীকরণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘ইনভেস্টর প্রোটেকশন রেগুলেশন’ প্রণয়ন এবং বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আদালত’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের পুনর্গঠন:
দেশের সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য বিএনপি একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, অবসায়িত বা সংকটে পড়া ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও তদারকি ক্ষমতা শক্তিশালী করাও পরিকল্পনার অংশ।
পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন’ এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিএনপি আশা করছে, দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও স্থিতিশীল করে তোলা সম্ভব হবে।
শিল্প সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে। দলটি দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুনরুদ্ধার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎমুখী ‘স্মার্ট’ অর্থনীতি গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের দেশীয় শিল্পের বিকাশে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ নীতি গ্রহণ করা হবে। এর মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সহায়তা করা হবে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) বিশেষ প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এছাড়া বন্ধ থাকা পাটকল, বস্ত্রকল ও চিনি কল পুনরায় চালু করতে বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগ দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিক ও উদ্যোক্তাদের পুনরায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
রপ্তানিমুখী শিল্পকে বৈচিত্র্যময় করতে ‘ন্যাশনাল ট্রেড কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল’ এবং ‘কৌশলগত টেক্সটাইল ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ধরনের কাঠামো শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। ভবিষ্যৎমুখী অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যে বিএনপি আইসিটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার হাব স্থাপনের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত।
ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিতে পেপাল সুবিধা চালু এবং কেনাকাটার জন্য জাতীয় ই-ওয়ালেট চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে ফাইবার অপটিক ও লো-অরবিট স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। এভাবে বিএনপি দেশীয় শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সমন্বয় ঘটিয়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে।
বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা:
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতের উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছে। দলটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসার, এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করতে সব গোপন চুক্তি বাতিল করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং জাতীয় গ্রিডকে ‘স্মার্ট গ্রিডে’ রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তদন্ত ও পর্যালোচনা করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে দ্রুতগতির ট্রেন (বুলেট ট্রেন), যমুনা নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ এবং উপকূলীয় দ্বীপের সাথে আধুনিক ফেরি যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে বিএনপি একটি সমন্বিত ও আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। এর আওতায় জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড স্থাপন এবং যমুনা ও পদ্মা নদীতে দ্বিতীয় সেতু ও টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের জন্য বিদ্যমান রেললাইন ডাবল-ট্র্যাক করা এবং পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে বুলেট ট্রেন সংযোগ স্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
নৌ-পরিবহন ব্যবস্থায় শহরের চারপাশে বৃত্তাকার জলপথ এবং আধুনিক ওয়াটার হাইওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় দ্বীপের সঙ্গে ফেরি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, স্মার্ট ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করে শহরে যানজট কমানো হবে। এসব উদ্যোগ দেশের অবকাঠামো ও পরিবহন খাতকে উন্নত, নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে সহায়তা করবে।
টেকসই সামুদ্রিক অর্থনীতি:
সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিএনপি একটি ‘জাতীয় সুনীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ’ ও ‘মেরিটাইম ইনোভেশন ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই খাতের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে মৎস্য সম্পদ আহরণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, এবং সামুদ্রিক শৈবাল ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে বিকাশের সুযোগ দেওয়া হবে। পরিবেশবান্ধব জাহাজ নির্মাণ ও রিসাইক্লিং, উপকূলীয় অঞ্চলে ইকো-টুরিজম এবং লবণসহনশীল কৃষি প্রসারের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।
কর প্রশাসন ও স্বচ্ছ শাসন:
রাজস্ব আয়ের শৃঙ্খলা ফেরাতে ভ্যাট হার যৌক্তিকীকরণ, আয়কর ভিত্তি সম্প্রসারণ, মেগা প্রকল্পের অপচয় রোধে সংসদীয় নজরদারি, এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তামাক ও দূষণকারী জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ এবং কর ছাড় সংস্কারের যৌক্তিকীকরণ করা হবে। ডিজিটাল অডিট এবং আয়কর রিটার্ন আদালতের মাধ্যমে তলবযোগ্য করার মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন, এই ইশতেহার কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা, যা প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলবে। বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ স্বনির্ভর ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

