ঢাকার কেন্দ্রীয় কিছু এলাকা দীর্ঘদিন ধরে জনঘনত্ব, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে জনজীবন ও অর্থনীতিতে বিপর্যয়গ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সরকার এবার এসব এলাকা নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত নগর পুনর্জাগরণ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে।
হাজারীবাগ, ইসলামবাগ, লালবাগ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর এবং গাবতলীর পূর্ব ও পশ্চিমাংশসহ মোট ১০টি এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য পরিত্যক্ত ও দূষিত নগরভূমিকে পুনরায় বাসযোগ্য ও উৎপাদনশীল করে তোলা।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রকল্পটির জন্য ৩৬.৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। অর্থায়ন দেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সমন্বিত নগর পুনর্জাগরণ ও পুনরুদ্ধার নীতিমালা, যা ঝুঁকিভিত্তিক পুনরুদ্ধার (রিস্ক–বেইজড রিমেডিয়েশন), ভূমিভিত্তিক অর্থায়ন (ল্যান্ড–বেইজড ফাইন্যান্সিং), বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু সহনশীল নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত করবে। প্রতিটি এলাকায় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (ইঅ্যান্ডএস), বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা এবং ব্যয় নিরূপণ করা হবে। প্রকল্পটি দুটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে।
প্যাকেজ–১: শুধুমাত্র হাজারীবাগ এলাকায় বাস্তবায়িত হবে, যার পরিধি প্রায় ১১১ একর। এখানে নগর পুনর্জাগরণ কৌশল, পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, ট্রাফিক প্রভাব মূল্যায়ন, বিস্তারিত সাইট প্ল্যান, প্রকৌশল নকশা এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। ভিজ্যুয়াল অ্যানিমেশনসহ একটি সমন্বিত প্রকল্প নকশা প্রতিবেদনও প্রস্তুত হবে।
প্যাকেজ–২: ইসলামবাগ, লালবাগ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর এবং গাবতলীর পূর্ব ও পশ্চিমাংশের প্রায় ১২০ একর এলাকায় কার্যকর হবে। এখানে নগর পুনর্জাগরণ কৌশল, পুনর্বাসন পরিকল্পনা, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, ট্রাফিক মূল্যায়ন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, সাইট লে–আউট, ধারণাগত স্থাপত্য নকশা এবং ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনাসহ সমন্বিত প্রকল্প নকশা প্রতিবেদন তৈরি হবে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একসময় দেশের ট্যানারি শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হাজারীবাগ কারখানা স্থানান্তরের পর দূষিত ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। পুরান ঢাকার অন্যান্য এলাকায়ও সীমিত জমির মধ্যে অকার্যকর ও অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফরমা (ডিপিপি) অনুযায়ী, দুই কোটির বেশি জনসংখ্যার ঢাকা দেশের অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। জাতীয় জিডিপির প্রায় ৩৬ শতাংশ এবং মোট কর্মসংস্থানের ৩২ শতাংশ এখানেই কেন্দ্রীভূত। তবে জমির স্বল্পতা, অবকাঠামোর ওপর চাপ, আবাসন সংকট এবং পরিবেশের অবনতিই শহরের প্রবৃদ্ধি ও বাসযোগ্যতা বাধাগ্রস্ত করছে।
ডিপিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার অনেক কেন্দ্রীয় এলাকা একসময় প্রাণবন্ত অর্থনৈতিক কেন্দ্র ছিল—যা বর্তমানে কম ব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত। এসব এলাকা পুনরুজ্জীবিত করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জীবিকায় উন্নয়ন সম্ভব। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতেও সহায়ক হবে। নগর পুনর্জাগরণ প্রকল্প জনপরিসর উন্নত করবে, সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়াবে এবং টেকসই উন্নয়ন চর্চা উৎসাহিত করবে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে এটি সহায়ক হওয়ার পাশাপাশি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল নগর পরিবেশ গড়ে তুলবে।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের সরাসরি উপকারভোগী হবেন টাউন প্ল্যানিং বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মীরা। নির্বাচিত এলাকার বাসিন্দারা উন্নত অবকাঠামো ও পরিবেশগত সুবিধা পাবেন। নগর পরিকল্পনাবিদ, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা ভবিষ্যৎ পুনর্জাগরণ প্রকল্পের জন্য কাঠামোবদ্ধ নির্দেশনা পাবেন।

