রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যখন দেশি–বিদেশি বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে, তখনই নতুন বিনিয়োগ নিয়ে মাঠে নেমেছে দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী আকিজের দুটি সহযোগী গ্রুপ। পোলট্রি ও প্রাণী খাদ্য থেকে শুরু করে ফার্মেসি, হালকা প্রকৌশল, কেবল উৎপাদন—একাধিক খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে আকিজ রিসোর্স গ্রুপ ও আকিজ বশির গ্রুপ।
গত এক বছরে পোলট্রি ও প্রাণী খাদ্য, হালকা প্রকৌশল এবং ফার্মেসি খাতে আকিজ রিসোর্স গ্রুপের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০০ কোটি টাকায়। বিনিয়োগ স্থবিরতার এই সময়ে গ্রুপটির এই উদ্যোগ শিল্পখাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আকিজ গ্রুপেরই একটি প্রতিষ্ঠান ছিল আকিজ রিসোর্স গ্রুপ। তবে ২০২০ সাল থেকে এটি আলাদা পরিচয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জসিম উদ্দিন। তিনি আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শেখ আকিজ উদ্দিনের ছেলে।
আকিজ পরিবারের বিভিন্ন সদস্য আলাদা আলাদা গ্রুপ গড়ে তুলেছেন। শেখ নাসির উদ্দিন আকিজ গ্রুপ, শেখ বশির উদ্দিন আকিজ বশির গ্রুপ, শেখ জামিল উদ্দিন আকিজ ইনসাফ, শেখ জসিম উদ্দিন আকিজ রিসোর্স গ্রুপ এবং শেখ শামীম উদ্দিন আকিজ ভেঞ্চার লিমিটেড পরিচালনা করছেন। তাদের মধ্যে শেখ বশির উদ্দিন বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টার দায়িত্বে আছেন।
মুন্সীগঞ্জে আকিজ রিসোর্স স্থাপন করেছে আকিজ ফিড কারখানা। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে সেখানে পোলট্রি, গবাদি পশু ও মৎস্য খামারের জন্য ফিড উৎপাদন শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে গত জুনে ফার্মেসি খাতে বিনিয়োগ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এখন পর্যন্ত ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মোট ১২টি ফার্মেসি চালু হয়েছে, যা ‘আকিজ ফার্মেসি’ নামে নিজস্ব মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে আরও বিস্তৃত হওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে গ্রুপটির। ফার্মেসির পাশাপাশি ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম সেন্টারটি স্থাপিত হবে ঢাকার মিরপুরে। পাশাপাশি চিকিৎসা যন্ত্রপাতি উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া কৃষিখাতে ব্যবহৃত কীটনাশক, রাসায়নিক ও সার উৎপাদনে বিনিয়োগের চিন্তা করছে আকিজ রিসোর্স। শহরভিত্তিক ছোট আকারের সুপারশপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলে গত নভেম্বরে ‘মুনাফা ইসলামিক ডিজিটাল ব্যাংক’ নামে একটি ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছে গ্রুপটি।
গণমাধ্যমকে শেখ জসিম উদ্দিন জানান, গত তিন বছরে বিভিন্ন খাতে তাদের বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আগামী সাত বছরে মোট ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তিন বছরেই বিনিয়োগ হবে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ সিমেন্ট, ইস্পাত, কেবল, প্যাকেজিং ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যয় করা হবে।
অন্যদিকে দ্রুত সম্প্রসারণশীল কেবল উৎপাদন খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে আকিজ বশির গ্রুপ। গত ৮ জানুয়ারি ঢাকায় এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্রুপটি জানায়, প্রাথমিকভাবে দেশীয় চাহিদা মেটাতে শিল্প ও যোগাযোগ খাতে ব্যবহৃত কেবল উৎপাদন করা হবে। পরবর্তী ধাপে উচ্চ ভোল্টেজ ও বিশেষায়িত কেবল উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইতোমধ্যে এমিনেন্স কেবল সেন্ট্রাল ওয়েলের মালিকানাধীন প্রায় প্রস্তুত একটি কেবল উৎপাদন কারখানা অধিগ্রহণ করেছে আকিজ বশির গ্রুপ। প্রাথমিক পর্যায়ে এই কারখানায় বছরে প্রায় ৩০০ টন কপার কেবল এবং ২০০ টন পিভিসি প্রক্রিয়াজাত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ সংকোচনের এই সময়ে আকিজ পরিবারের দুই গ্রুপের ধারাবাহিক বিনিয়োগ দেশের শিল্পখাতে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

