নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির বাস্তব চিত্র সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক খাত এখন বড় পরীক্ষার মুখে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের চ্যালেঞ্জ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন।
ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ এখন খেলাপি। একই চিত্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং শক্ত আইনি কাঠামো গড়ে তোলা নতুন সরকারের প্রথম সারির অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও অর্থ ঋণ আদালত আইন পাস করা জরুরি ছিল। কিন্তু তা হয়নি। তাঁর মতে, নতুন সরকারের উচিত শুরুতেই আইনি ভিত্তি শক্ত করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আর্থিক অপরাধ ঘটতে না পারে। যে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখা এবং আর্থিক অপরাধে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদকালে আর্থিক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কথা সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কিছু ব্যবসায়ী দেশের একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়ান। এসব অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। এর ফলে কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অনেক আমানতকারী তাঁদের জমা টাকা ফেরত পেতে ব্যর্থ হন।
এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোকে এক কাঠামোর আওতায় এনে স্থিতিশীলতা ফেরানো। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু একীভূত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। খাতটির ভেতরে যে অনিয়মের শেকড় তৈরি হয়েছে, তা উপড়ে ফেলতে হবে।
খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপসহ যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে খাত দুর্বল করার অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে চলমান সংস্কার কতটা টেকসই হবে। পাশাপাশি আর্থিক ভিত্তি মজবুত করতে একাধিক আইন দ্রুত পাস করতে হবে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল না করতে পারলে সামগ্রিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে না। তাই শুরুতেই কঠোর ও সুসংহত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার।
নাজুক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও খেলাপির অস্বাভাবিক উল্লম্ফন:
দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু ব্যাংকিং খাত। নাজুক অবস্থায় থাকা পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া ঘিরে আমানতকারী ও চাকরি হারানো কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নানা দাবিতে তাঁরা আন্দোলন করছেন।
একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ হিসাবধারী রয়েছেন। আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংক অধিগ্রহণ করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্তও বাস্তবায়নের পথে। এই দুই উদ্যোগ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
খাত–সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু একীভূতকরণ যথেষ্ট নয়। পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানো এবং খেলাপি ঋণ কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। আইনি ভিত্তি শক্তিশালী না হলে সংস্কার টেকসই হবে না। ব্যাংক কোম্পানি আইন হালনাগাদ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক–এর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এতে খেলাপি ঋণের হার হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এক বছরে এই উল্লম্ফন খাতের গভীর সংকটই ইঙ্গিত করছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, আগের সরকারের আমলে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর প্রবণতা ছিল। এখন তা হচ্ছে না। এ ছাড়া অনেক ঋণগ্রহীতা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় তাঁদের ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়েছে। ফলে এসব অর্থ কীভাবে আদায় হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কৌশল নির্ধারণ জরুরি।
বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত চালু করতে হবে। কারণ নতুন কারখানা স্থাপন করে কর্মসংস্থান বাড়ানো সময়সাপেক্ষ। আর কর্মসংস্থান না বাড়লে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাও বাড়বে না। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন এখন কেবল আর্থিক ইস্যু নয়। এটি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও আস্থার প্রশ্ন। আইনি সংস্কার, জবাবদিহি ও কার্যকর পুনর্গঠনের মাধ্যমেই এই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
প্রয়োজন শক্তিশালী আইনি ভিত্তি:
ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং অনিয়মে লাগাম টানা। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি হয়। পাশাপাশি তদারকি জোরদার করতে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। খেলাপি ঋণ আদায় ও অর্থ উদ্ধারের গতি বাড়াতে অর্থ ঋণ আদালত আইন সংস্কারের কথাও আসে।
তবে শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ আইনে পরিণত হয়নি। ফলে বাস্তবায়ন থেমে আছে প্রস্তাবের পর্যায়ে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই আইনগুলো দ্রুত পাস করে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। আইনি কাঠামো শক্ত না হলে আর্থিক খাতে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
খাত–সংশ্লিষ্টদের ধারণা, শুধু আইন করলেই হবে না। ব্যবসা–বাণিজ্য চাঙা করতে সুদহার কমানো, ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক লেনদেনের সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এতে ডলার নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ তুলনামূলক কম থাকতে পারে। তবে এই স্থিতি ধরে রাখতে নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান নতুন সরকারের জন্য কয়েকটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন। তাঁর মতে, সবার আগে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি জরুরি। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ। কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত না হলে বিনিয়োগও বাড়বে না। কর আদায় বাড়িয়ে সরকারের ঋণ নির্ভরতা কমাতে হবে। তাতে বেসরকারি খাত বেশি ঋণ পাবে এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক একীভূতকরণ এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করা ছাড়া বিকল্প নেই। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংস্কার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত এই সংস্কারের সফলতা নির্ভর করবে কারা আর্থিক খাতের নেতৃত্বে থাকবেন এবং তাঁরা কতটা দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তার ওপর।
নতুন সরকারের অর্থনৈতিক রূপরেখায় আর্থিক খাতই হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় ইস্যু। আইন, নীতি ও বাস্তবায়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।