বহুমাত্রিক চাপে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ঋণের উঁচু সুদহার এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চরম স্থবিরতার মুখোমুখি। উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় বছরে অন্তত ৫০০ ছোট-বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে লাখো কর্মী বেকার হয়েছেন। শিল্পোৎপাদন সূচকও কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। শুধু আশ্বাস দিয়ে এই ক্ষতি পূরণ হবে না, বলছেন ব্যবসায়ীরা।
শিল্পে রক্তক্ষরণ থামাতে প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা, বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটাতে দীর্ঘদিন ধরে তারা একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল সরকারের প্রত্যাশা করছিলেন। সম্প্রতি উৎসবমুখর নির্বাচনে বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা জয় নিশ্চিত হওয়ার পর, তারা আশা করছেন তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার এই আস্থা ফিরিয়ে আনবে। দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের বড় অংশই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল।
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এই খাতে আস্থা ও গতি ফিরিয়ে আনা। দ্রুত নীতি সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার না হলে সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কঠিন হবে।
শিল্পখাতের সমস্যা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে:
রপ্তানি খাত থেকে শুরু করে আবাসন, ইস্পাত, সিমেন্ট ও চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তারা স্বীকার করছেন, শিল্পের অভ্যন্তরীণ ক্ষত এখন গভীর। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন বিনিয়োগের হার গত কয়েক প্রান্তিকে আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না।
গত ৪ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা এই দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরেন। তাঁরা জানান, উৎপাদন খরচ জ্যামিতিক হারে বাড়লেও নীতি সহায়তা পর্যাপ্ত নেই। ঋণের উচ্চ সুদ ও জ্বালানি অনিশ্চয়তা শিল্পকে দুর্বল করছে।
বৈঠকের পর এফবিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “আমরা জ্বালানি সমস্যা, আইন-শৃঙ্খলা, শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যবসার খরচ কমানো, ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমানো—সব সমস্যা তুলে ধরেছি। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। প্রশাসনিক হয়রানি ও নীতিগত বাধা কমাতে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।” বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, “ব্যবসায়ীদের সম্মান জরুরি। বড় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন।”
আস্থা পুনঃস্থাপনের উপায়:
উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পঋণের প্রবাহ বাড়াতে জ্বালানি স্থিতিশীল করা ও ঋণের সুদহার কমানো জরুরি। পাশাপাশি শ্রম আইনের আধুনিকায়ন, শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং প্রশাসনিক হয়রানি কমানো অপরিহার্য। নীতি নির্ধারণের পাশাপাশি বাস্তবায়নেও আস্থা তৈরি করতে হবে।
কয়েক বছর ধরে শিল্পোদ্যোক্তারা একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন। জ্বালানি সংকট, ঋণের অসহনীয় সুদ, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং শ্রমিক অসন্তোষ—সব মিলিয়ে শিল্পোৎপাদন সীমিত হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর বৈঠকগুলোতে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের বড় অন্তরায় এখন আস্থার সংকট।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, “বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক আস্থা পুনরুদ্ধার। এরপর ব্যবসা সহজীকরণ, সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন, জ্বালানি স্থিতিশীল রাখা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করতে হবে।”
বিজিএমইএ-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “রপ্তানি খাত স্থিতিশীলতা ছাড়া টিকে থাকতে পারবে না। বিদেশি ক্রেতারা সরবরাহ চেইনের নির্ভরযোগ্যতা দেখতে চান। নতুন সরকার যদি দ্রুত অর্থনৈতিক কূটনীতি ও কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করে, আস্থা বাড়বে।”
মূল্যবৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতার পতন:
খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায়শই দুই অঙ্কে পৌঁছেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তব আয় কমায় চাহিদা হ্রাস, যা ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম বিনিয়োগ একসঙ্গে থাকলে অর্থনীতি ধীর হয়। রাজনৈতিক ম্যান্ডেট কাজে লাগিয়ে নতুন সরকার যদি দ্রুত নীতিগত সংস্কার শুরু করে, বাজারে ইতিবাচক বার্তা যাবে।”
তিন দফা চ্যালেঞ্জ ও রোডম্যাপ:
পরিকল্পনা কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত হয়েছে: বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি, আমদানি-রপ্তানিতে অস্থিরতা, টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সরকারি ঋণনির্ভরতা। উদ্যোক্তারা তিনটি স্পষ্ট রোডম্যাপ চান।
- প্রথমত, জ্বালানি—গ্যাস ও বিদ্যুতের—নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, ব্যাংকঋণের সুদহার কমিয়ে ছোট ও মাঝারি শিল্পের বোঝা হ্রাস করতে হবে।
- তৃতীয়ত, প্রশাসনিক হয়রানি কমিয়ে ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে উন্নতি আনতে হবে। ওয়ানস্টপ সার্ভিস বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।
নতুন নীতি অংশগ্রহণমূলক হওয়া প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের সঙ্গে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক থাকবেন, যা প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বাধা দেবে। ভোটের রায়ে রাজনৈতিক অধ্যায় নতুন মোড় নিয়েছে। এখন নজর অর্থনীতিতে। বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানে গতি আনা—নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা দুর্বলতা ও নীতি নির্ধারণে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত না করার কারণে প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি থমকে গেছে। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনা বিনিয়োগ পরিবেশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”

