প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত নতুন বাণিজ্য চুক্তির ফলে দুই দেশের পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বড় পরিবর্তন আসছে। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ১৩২টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বিপরীতে বাংলাদেশের ২ হাজার ৫০০ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একই সুবিধা পাবে।
গতকাল রোববার রাতে ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া বাংলাদেশের পণ্যের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য।
বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন:
বাংলাদেশের ট্যারিফ লাইনে মোট পণ্যের সংখ্যা ৭ হাজার ৪৫৮টি। এর মধ্যে ৩২৬টি বাদে বাকি সব মার্কিন পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হবে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি সইয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪১টি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। ৭ হাজার ১৩২টি পণ্যের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকেই ৪ হাজার ৯২২টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর হয়েছে।
অন্যদিকে ১ হাজার ৫৩৮টি পণ্যের শুল্ক পাঁচ বছরের মধ্যে শূন্যে নামানো হবে। প্রথম বছরে শুল্কহার ৫০ শতাংশ কমানো হবে। পরবর্তী চার বছরে বাকি ৫০ শতাংশ সমান হারে কমিয়ে শূন্য করা হবে। আর ৬৭২টি পণ্যের শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে। এখানেও প্রথম বছরে ৫০ শতাংশ কমানো হবে। পরবর্তী নয় বছরে অবশিষ্ট অংশ ধাপে ধাপে কমিয়ে শূন্যে নামানো হবে।
ড. ইউনূস জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য কেনার অঙ্গীকার করা হয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশ আগে অন্য উৎস থেকে কিনত। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য হওয়ায় সে বাজার ধরে রাখতে উৎস পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক চুক্তি করেছে। অনলাইনে উন্মুক্ত চুক্তিগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন বিডি-ইউএস রেসিপ্রোকাল ট্রেড’-এর মিল রয়েছে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ট্রেড চুক্তি সইয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের খসড়ায় এমন বিধান নেই। চুক্তিতে চীন, রাশিয়াসহ নন-ইকোনমিক মার্কেটের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না করার কোনো উল্লেখ নেই বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা।
রুলস অব অরিজিন অংশে বিদেশি বা স্থানীয় মূল্য সংযোজনের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া সহজ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রেও শুল্কমুক্ত সুবিধার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চুক্তিতে কাগজবিহীন বাণিজ্য, মেধাস্বত্ব অধিকার নিশ্চিতকরণ, ই-কমার্স লেনদেনে কাস্টমস শুল্ক আরোপে স্থায়ী স্থগিতাদেশ, কারিগরি ও অশুল্ক বাধা কমানো, কনফর্মিটি অ্যাসেসমেন্ট সার্টিফিকেট, সুশাসন এবং পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ৯টি আইপিআর-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনে সমর্থন দেওয়ার নীতিগত সম্মতি দিয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সনদ থাকলে মার্কেট অথরাইজেশনের জন্য পূর্বানুমতি প্রয়োজন হবে না। খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি, ডেইরি, মাংস ও পোল্ট্রি পণ্যে মার্কিন সনদের গ্রহণযোগ্যতা, কৃষি বায়োটেকনোলজি নিবন্ধন নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জীবন্ত পোল্ট্রি আমদানি এবং ম্যাক্সিমাম রেসিডিউ লিমিট স্বীকৃতির বিষয়ও চুক্তিতে রয়েছে।
ইন্স্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা উদার করা, দুর্নীতিবিরোধী বিধান কার্যকর করা, ডব্লিউটিওর ফিশারিজ সাবসিডি চুক্তি গ্রহণ এবং আইইউইউ ক্ষেত্রে ভর্তুকি না দেওয়ার বিষয় উল্লেখ আছে। শ্রম আইন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হালনাগাদের কথাও বলা হয়েছে।
ডিজিটাল ট্রেড ও প্রযুক্তি খাতে ক্রস-বর্ডার প্রাইভেসি রুলস, পার্সোনাল ডাটা প্রটেকশন স্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। পাশাপাশি বোয়িং ক্রয়, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টার কথাও খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সুফল অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।

