সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের বার্তা নিয়ে রমজান এলেও বাজারে তার ছাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের পরও রোজার আগমুহূর্তে ছোলা, ব্রয়লার মুরগি, লেবু ও ইফতার সামগ্রীর দাম বেড়ে গেছে। দুই দিনের ব্যবধানে ছোলার কেজিতে ১০ টাকা এবং ব্রয়লারের কেজিতে ২০ টাকার মতো বৃদ্ধি ভোগান্তি সৃষ্টি করেছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য।
ভোক্তারা বলছেন, রমজান যেন ব্যবসায়ীদের জন্য মুনাফার মাস। এই সময়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। নির্বাচনের অজুহাতে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিদপ্তরের তদারকিও ততটা কার্যকর নয়। ব্যবসায়ীরা মজুত বাড়িয়ে ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেটের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছেন।
ইফতারের প্রধান উপকরণ ছোলার দাম মাস দুয়েক আগে ৮০ টাকায় নেমেছিল। নির্বাচনের পর দাম লাফ দিয়ে বেড়ে ৯০ থেকে ১০০ টাকায় পৌঁছেছে। তবে এই দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫–৩০ টাকা কম।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দেশে ছোলার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন। রমজানকালে লাগে প্রায় ১ লাখ টন। আমদানিকারকরা বলছেন, বাস্তব চাহিদা দুই লাখ টনের কাছাকাছি। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছোলা আমদানিতে খরচ হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি ডলার। কারওয়ান বাজারের ইয়াসিন জেনারেল স্টোরের মালিক জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরায়ও তার প্রভাব পড়েছে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের ভরসা ব্রয়লার মুরগি। দুই-আড়াই মাস ধরে দেড়শ টাকার কিছু বেশি ছিল ব্রয়লারের কেজি। সপ্তাহ দুয়েক আগে দাম বেড়ে ১৮০ টাকার ঘর স্পর্শ করেছিল। গতকাল এটি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি জাতের মুরগির দামও বেড়ে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কেজিতে ২০ টাকার মতো বৃদ্ধি হয়েছে।
বিগত দুই দশকে রমজানের শুরুতে খেজুরের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতো। তবে এবার গত বছরের মতো দাম কমেছে। জায়েদি খেজুরের কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, মরিয়ম ও আজওয়া ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং মেডজুল খেজুর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়। দেশে খেজুরের পুরো চাহিদা আমদানি করে পূরণ করা হয়; চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৯৩১ টন খেজুর আমদানি হয়েছে।
রমজানে শরবতের জন্য লেবু অপরিহার্য। দুই সপ্তাহে লেবুর দাম বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা হয়েছে, আগের ৫০–৬০ টাকার তুলনায়। মালটা বিক্রি হচ্ছে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা, আপেল ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা। দেশি ফলের দামও কিছুটা বেড়েছে; পেয়ারার কেজি দেড়শ টাকায় পৌঁছেছে এবং কলার দাম ১০–২০ টাকা বেড়েছে।
সবজির মধ্যে বেগুন কেজিতে ৮০ থেকে ৯০ টাকা, শসা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শিম ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ১০০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু ও পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হওয়ায় দাম কমেছে। আলুর কেজি ২০ টাকা, পেঁয়াজ ৫৫–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল; কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকায়। কোথাও দেশি গরু কেজি ৮০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
সরকার রমজানে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, গরুর মাংস ও ব্রয়লার মুরগি (ড্রেসড) সরবরাহ করবে। ব্রয়লার মুরগি কেজি ২৪৫ টাকা, পাস্তুরিত দুধ প্রতি লিটার ৮০ টাকা, ডিম প্রতি পিস ৮ টাকা এবং গরুর মাংস কেজি ৬৫০ টাকায় বিক্রি হবে।
টিসিবি খেজুর ও ছোলা ছাড়াও ভোজ্যতেল, চিনি ও ডাল বিক্রি করবে। ঢাকা ও সিটি করপোরেশনের ২৫টি স্থানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু সুফিয়ান জানিয়েছেন, বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে রমজান চলাকালীন এসব খাদ্যপণ্য সুলভ মূল্যে সরবরাহ হবে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রমজান এলেই কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ায়। নতুন সরকারের কাছে ভোক্তারা আশা করছেন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

