মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়াসের সঙ্গে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ধীরগতিও যুক্ত হয়ে গেছে। তবে সমস্যার সঙ্গে যুক্ত আছে কর আদায়ের নিম্নমান, খেলাপি ঋণ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি এবং শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়ও কমছে। কর আদায়ের ঘাটতি এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে দেশি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়েছে। বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধের চাপও অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে।
এই চিত্র নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নোটে তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। সূত্র জানিয়েছে, নোটে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং প্রধান চ্যালেঞ্জ বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উত্তরাধিকার নোটে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
-
ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
-
বাজার ব্যবস্থায় আস্থা পুনরুদ্ধার
-
রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি
বিশেষভাবে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান সংস্কার কার্যক্রম, কর অব্যাহতি পর্যালোচনা, আয়কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং কাস্টমস আধুনিকায়নে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বুধবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। শপথের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হবে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বিগত সময়ে বলেছিলেন, নতুন সরকারের জন্য এমন একটি রাস্তা তৈরি করবেন যাতে মন্ত্রী সহজে কাজ এগিয়ে নিতে পারেন। সদ্যবিদায়ি অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছেন, নতুন অর্থমন্ত্রীর সুবিধার জন্য কয়েক পৃষ্ঠার সাকসেসর বা উত্তরাধিকার নোট রেখেছেন। তার মতে, নতুন সরকারকে নতুন কাজ শুরু করার আগে চলমান সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা উচিত।
নোটে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতির প্রবণতা, রাজস্ব খাতের অবস্থা, মুদ্রা ও আর্থিক খাত, বৈদেশিক খাত এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর চলমান কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া অর্থনৈতিক খাতের প্রধান সংস্কার প্রতিশ্রুতি, চলমান কর্মসূচি, সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং অগ্রাধিকার বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এটি অর্থ উপদেষ্টার হ্যান্ডওভার নোট বলা হয়েছে, তবে অর্থ বিভাগ ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শীর্ষক নামে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, যা নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ:
উত্তরাধিকার নোটে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের ব্যাংক খাত সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট) অনুসারে, ২০০৮-২০২৩ সালের ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়েছে। একই অবস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও। নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনা এবং শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করা, যাতে নতুন করে কোনো অনিয়ম না হয়।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নোটে আরও বলেছেন, গত সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদহার বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ০.৫৮ শতাংশ এবং ০.৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলেও খেলাপি ঋণ, পুঁজি ঘাটতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা রয়ে গেছে। আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ গত নভেম্বরে ৬.৫৮ শতাংশ কমেছে। অন্তর্বর্তী সরকার মুদ্রা ও আর্থিক খাতের নতুন আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে। প্রণীত ও সংশোধিত আইনের মধ্যে রয়েছে:
- ব্যাংক কোম্পানি আইন (সংশোধন)
- ফিন্যান্স কোম্পানি আইন
- সিকিউরড ট্রানজেকশন আইন
- নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট
- অর্থ ঋণ আদালত আইন (সংশোধন)
- আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ
- ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ
ঝুঁকিপূর্ণ বা ব্যর্থ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যাংক রিসলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যর্থ ব্যাংকের রিসলিউশনের পূর্ণ ক্ষমতাপ্রাপ্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ব্যাংক রিসোলিউশন ইউনিট গঠন করা হয়েছে, যাতে সংকটাপন্ন ব্যাংকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করা যায়। রিসলিউশন প্রক্রিয়ায় ছোট আমানতকারীর সুরক্ষা এবং ব্যাংকিং সেবার ধারাবাহিকতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, যা সরকারের জন্য বড় ধরনের বোঝা।
তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও বাজার নীতি: অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নোটে সামষ্টিক অর্থনীতির তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন:
- নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি সুষ্ঠু করা
- বাজার পর্যবেক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা দূর করা
- সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা
- ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস চালু করে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কাছাকাছি আসার প্রত্যাশা রয়েছে। সরকারের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং কৃচ্ছ সাধনের কারণে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই ৯ শতাংশের নিচে নামছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির প্রবৃদ্ধি থাকলেও রপ্তানির প্রবৃদ্ধি অপেক্ষাকৃত কম। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন আশানুরূপ না হওয়ায় রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

