দেশের ব্যাংক খাতে যে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এখন উদ্বেগ স্পষ্ট। অনেকের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না। ব্যাংক জালিয়াতি, লাগামহীন ঋণ বিতরণ এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি—সবকিছুর পেছনে নীতিগত দুর্বলতার প্রভাব ছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে উঠে আসে ভয়াবহ চিত্র। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৪ শতাংশেরও বেশি। অর্থের অঙ্কে যা প্রায় ছয় ট্রিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ৬ লাখ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের পরিমাণ বোঝাতে বলা হয়, এতে ১৯টি পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব।
এই অবস্থায় কয়েকটি ব্যাংক টিকে থাকতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রয়োজন হতে পারে বড় অঙ্কের বেইলআউট। না হলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি মহল বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল। সেই অর্থ অতিমূল্যায়িত আমদানি ব্যয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়। পরে এসব ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। এতে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টাকার দ্রুত অবমূল্যায়নের পেছনেও এই চাপ বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেইলআউটের সম্ভাব্য ব্যয়ও কম নয়। আনুমানিক প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন টাকা সরকারি তহবিল থেকে দিতে হতে পারে। এই অর্থের মূল লক্ষ্য হবে অন্তত আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অন্যথায় ব্যাংক খাতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এই অর্থ জোগান দেবে কীভাবে সরকার? যদি বিপুল অঙ্কের টাকা ছাপানো হয়, তবে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে। টাকার অবমূল্যায়নও ত্বরান্বিত হবে। বিকল্প হিসেবে সরকার বন্ড বিক্রির পথ বেছে নিতে পারে। সাধারণত সুস্থ ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ড কিনতে আগ্রহী থাকে, কারণ এটি ব্যবসায়িক ঋণের তুলনায় কম ঝুঁকিপূর্ণ। তবে বিপুল পরিমাণ বন্ড বাজারে এলে বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে। এতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি কয়েক বছর ধীর হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় আর্থিক ঘাটতি ও নিম্ন সুদের হার একসঙ্গে বজায় থাকলে মুদ্রাস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন প্রায় অনিবার্য। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার বড় ঘাটতির পাশাপাশি একক অঙ্কের সুদহার নির্ধারণ করে ব্যাংকগুলোকে কম সুদে ঋণ দিতে বাধ্য করেছিল। এতে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা আরও বেড়ে যায়।
অনেক দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। বড় ঘাটতির চাপে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা, আগের সরকার আমলে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে গত কয়েক বছরের অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়ন অনেকটাই এড়ানো যেত।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শক্তিশালী ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাঠামো জরুরি। নইলে অতীতের সংকট আবারও ফিরে আসতে পারে।

