রমজান ও আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুম সামনে রেখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু স্পষ্ট করে জানান, রোজায় লোডশেডিং কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে সরকার।
গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ে প্রথম বৈঠকে তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার সকালে বিদ্যুৎ বিভাগের বকেয়া বিল ও চলমান মামলাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আরেকটি বৈঠক হবে। এতে বিদ্যুৎমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থাকার কথা রয়েছে!
২৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া:
বৈঠকে মন্ত্রীকে জানানো হয়, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বকেয়া প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। দ্রুত এই অর্থ পরিশোধ না করলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে বলে সতর্ক করেন কর্মকর্তারা। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হলে তিনি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ পৃথক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে। তবে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে দুই বিভাগের মধ্যে দায় চাপানোর প্রবণতাও দেখা যায়।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, রমজানে লোডশেডিংমুক্ত থাকতে হলে দৈনিক অন্তত ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। এপ্রিল থেকে এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ১১০ কোটি ঘনফুটে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিভাগ জানায়, বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করাই কঠিন। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ খাতে। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ বাড়ালে শিল্পকারখানায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
এ সময় আরও জানানো হয়, ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের ১৫০ কিলোমিটার বগুড়া–সৈয়দপুর পাইপলাইন এবং ২০ ইঞ্চি ব্যাসের ১৬৩ কিলোমিটার ভেড়ামারা–খুলনা পাইপলাইন অব্যবহৃত রয়েছে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। বকেয়া পরিশোধ নিয়ে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিপ্পা উদ্বেগ জানিয়েছে—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের অবস্থান নতুন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির শামিল। সরকারকে সময় দিতে হবে।
প্রথম দিনের বৈঠকেই উঠে আসে গ্যাস চুরির বিষয়টি। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তিতাস ও বাখরাবাদসহ বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানিতে সিস্টেম লসের আড়ালে ব্যাপক গ্যাস চুরি হচ্ছে। বর্তমানে শুধু তিতাস গ্যাসেই সিস্টেম লস ১০ শতাংশের বেশি।
এলএনজি আমদানির মূল্য বিবেচনায় নিলে এই খাতে বছরে লোকসান দাঁড়ায় ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা। মন্ত্রণালয় সূত্রে বলা হয়, গ্যাস চুরির কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
আগামী ১০০ দিনের মধ্যে সিস্টেম লস ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈঠকে মন্ত্রী জানতে চান, ১ শতাংশ সিস্টেম লস কমলে কত সাশ্রয় হবে। জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, এতে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। এরপরই গ্যাস চুরি ও অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২০ সালে দৈনিক উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৩৩১ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৪ সালে তা নেমে আসে ১ হাজার ৯৮৬ মিলিয়ন ঘনফুটে। ২০২৫ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮১৯ মিলিয়ন ঘনফুটে।
চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চাপ আরও তীব্র হচ্ছে। নতুন মন্ত্রীর প্রথম দিনের বৈঠকেই স্পষ্ট হয়েছে, সামনে বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবস্থাপনায় কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। বকেয়া পরিশোধ, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং চুরি রোধ—এই তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দ্রুত সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে জরুরি।

