বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। হাতে পাওয়া অর্থনীতি বহুমুখী চাপ ও অস্থিরতায় ভরা। বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির, কর্মসংস্থান থমকে গেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, আর মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। বাজারে অস্থিরতা চোখে পড়ে। এ অবস্থায় জনগণ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, নতুন সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে রমজানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। দেশের নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে। মধ্যবিত্ত চাপে আছে, নিম্নবিত্তের পরিস্থিতি আরও খারাপ। রমজানের শুরুতেই নতুন সরকারকে বাজার সামাল দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে।
বিনিয়োগ পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। ব্যবসায়ীরা দ্বিধাগ্রস্ত। জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরাপত্তা না থাকা বিনিয়োগে বড় বাধা। ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি খরচ বাড়িয়েছে। পুরো ব্যবসায়িক পরিবেশে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। এর প্রভাব রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতেও পড়েছে। পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বাজারে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি হয়নি।
আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘পাল্টা শুল্ক’ ব্যবস্থা মোকাবেলায় আগের সরকারের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তার ফলাফল মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জও নতুন সরকারের সামনে রয়েছে। অর্থাৎ, দায়িত্ব নেওয়ার মুহূর্তেই সরকারের ওপর রয়েছে সংস্কার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দায়িত্বের বড় বোঝা।
এদিকে, দেশের প্রধান অর্থ সরবরাহকারী ব্যাংক ব্যবস্থা নড়বড়ে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সুশাসনের ঘাটতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যাংক খাতকে বিপর্যস্ত করেছে। অনিয়মিত ঋণ, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ঋণখেলাপি সংস্কৃতি সমস্যা বাড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমবর্ধমান, অনেক ব্যাংক মূলধন সংকটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ কমানো ছাড়া ব্যাংক খাত স্বাভাবিক হতে পারবে না। নতুন সরকারকে ব্যাংক কমিশন গঠনের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজস্ব সংগ্রহেও সংকট। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৮ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। বহু বছর ধরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর আয় বাড়ছে না। সুশাসনও দুর্বল। আগের সরকার উচ্চ ব্যয়ে মেগা প্রকল্প করেছে, যা দেশের ওপর বিশাল বৈদেশিক ঋণের বোঝা দিয়েছে। বর্তমানে সরকারের ঋণ স্থিতি প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পে কমিশনের সুপারিশ রেখে গেছে, যা এক লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় বাড়াবে। রাজস্ব আয় সরকারি ব্যয় মেটাতে যথেষ্ট নয়। নতুন সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। নির্বাচনের আগে চার কোটি পরিবারকে আড়াই হাজার টাকার সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।
দুর্নীতিও বড় বাধা। প্রশাসন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন জায়গায় দুর্নীতি অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক। নতুন সরকার কতটা কঠোরভাবে এটি দমন করতে পারবে, তা এখন সবার নজরে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের খাতেও সংকট। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা ব্যয় বাড়াচ্ছে। শিল্পোৎপাদনের খরচ বেড়েছে, ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমছে। স্থানীয় শিল্পও চাপে। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মিত লোডশেডিং উৎপাদন ব্যাহত করছে। পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকট, লেনদেন কম, নতুন বিনিয়োগকারী আসছে না। নতুন সরকারকে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তি আছে। বৈদেশিক লেনদেন হিসাবে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) গত ডিসেম্বরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে, মূল কারণ উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ। তবে বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়লে চাপ রিজার্ভে বাড়বে। কৃষি উৎপাদনে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। ব্যাংক খাতেও কিছু সংস্কার দৃশ্যমান।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তারা মনে করছেন:
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী মনে করেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। সমকালকে তিনি বলেন, “গত দেড় বছরে অনেক শিল্প-কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। উৎপাদন বাড়াতে হলে আগে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তখনই বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি দেশের বড় সমস্যা। সুদের হার বেড়েছে, কিন্তু পণ্যের দাম কমছে না কারণ সরবরাহ সীমিত। স্থানীয় উৎপাদন কম, আমদানিও সীমিত। শুধু অভিযান চালালে হবে না, সরবরাহ বাড়াতে হবে। তবেই বাজার স্থিতিশীল হবে। তিনি জ্বালানি খাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বল্প মেয়াদে মার্জিনাল গ্যাসফিল্ড থেকে দ্রুত উত্তোলন বাড়ানো, দীর্ঘ মেয়াদে অনুসন্ধান বৃদ্ধি এবং অফশোর বিডিং পুনরায় চালু করার সুপারিশ করেছেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন অধ্যয়ন প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. এনামুল হক মনে করেন, নতুন সরকারের প্রধান কাজ হলো সংস্কার, ব্যয় সাশ্রয় এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষ যেন মনে করে, তাদের টাকা ব্যাংকে রাখা নিরাপদ – এই আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন না ফিরলে অর্থনীতি ঘুরবে না।”
ড. এনামুল হক আরও বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার এখন রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। দাম বাড়বে কিনা, মানুষ সেটিই দেখছে। তারা জানতে চায়, সরকার তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে কিনা। এতে মানুষের আস্থা তৈরি হবে এবং ঈদের পর অর্থনীতি গতিশীল হবে। তিনি সতর্ক করেছেন, দুর্নীতিবাজকে শাস্তি দিলেই হবে না। যেসব নিয়ম দুর্নীতিকে সুযোগ দেয়, সেগুলো বদলাতে হবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি রাজউকের কাজের কোনো নির্দিষ্ট ডেডলাইন না থাকা উল্লেখ করেছেন, যা কর্মকর্তাদের সুযোগ দেয়। প্রতিটি সরকারি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা উচিত।
বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, “স্বচ্ছতার অভাব ছিল। বিদেশি কোম্পানি দায়িত্ব নিলে দেশ উপকৃত হবে কিনা – সরকারের ব্যাখ্যা থাকা উচিত ছিল। নীতি পরিষ্কার হলে দেশি-বিদেশি যে কেউ অপারেট করতে পারবে।” যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রথমে দেখতে হবে চুক্তিটির আইনি বৈধতা আছে কিনা। বৈধ না হলে যারা এর পেছনে ছিলেন তাদের জবাবদিহিতে আনা হবে। বৈধ হলে মাথা ঠুকলেও উপায় নেই।”
এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “সতর্ক পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তবে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। আমাদের উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া।”
পারটেক্স স্টার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার মনে করেন, ব্যবসায় দীর্ঘ সময় ধরে ‘থেমে থাকা’ অবস্থায় ছিল। কয়েকটি গোষ্ঠীর বাইরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়নি। বাজারের গতি থাকলেও ব্যবসার বিস্তার হয়নি। এখন নতুন সরকার এসেছে। বিএনপি ক্ষমতায়, জামায়াত বিরোধী দলে – এটি নতুন রাজনৈতিক ভারসাম্য। তিনি বলেন, “যদি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বজায় থাকে এবং সরকার ব্যবসাবান্ধব হয়, দেশ এগোবে। নীতি তৈরির সময় দেশি বিনিয়োগকারীদের ভুলে গেলে চলবে না। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো শিল্প চলবে না।”

