ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সম্পদের তথ্য বিশ্লেষণ করে চমকপ্রদ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
সেখানে জানানো হয়, নির্বাচনে বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৭১ জনের সম্পদ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ মোট বিজয়ীদের ৯১.২৫ শতাংশই কোটিপতি। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—৫ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক রয়েছেন ১৮৭ জন, যা মোটের ৬২.৯৬ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালনা করেন সুজনের সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচিত ২০৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০১ জনই (৯৬.১৭%) কোটি টাকার অধিক সম্পদের মালিক।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত ৬৮ জনের মধ্যে ৫২ জন (৭৬.৪৭%) কোটিপতি।
এ থেকে বোঝা যায়, বড় দলগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চ সম্পদধারীদের উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে মাত্র ২ জনের সম্পদ ২৫ লাখ টাকার কম, যা মোটের ০.৬৭ শতাংশ। সম্পদের ঘর পূরণ না করা ৩ জনসহ এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ জনে (১.৬৮%)।
অন্যদিকে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের মধ্যে কোটিপতির হার ছিল ৫৫.৬৩ শতাংশ। কিন্তু বিজয়ীদের মধ্যে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১.২৫ শতাংশে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ২৫ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক ছিলেন ১৮.৭১ শতাংশ (৩৭৯ জন)। সম্পদের ঘর পূরণ না করা ৫৮ জনসহ এই হার ছিল ২১.৫৭ শতাংশ (৪৩৭ জন)। অথচ নির্বাচিতদের ক্ষেত্রে এই হার নেমে এসেছে মাত্র ০.৬৭ শতাংশে।
সুজনের বিশ্লেষণে বলা হয়, তুলনামূলকভাবে স্বল্প সম্পদের প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার হার কমছে। বিপরীতে, অধিক সম্পদের মালিকদের নির্বাচিত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ত্রয়োদশ সংসদে কোটিপতি এমপির হার আরও বেড়েছে।
-
দ্বাদশ সংসদে কোটিপতি বিজয়ীর হার ছিল ৮৯.৯৭ শতাংশ
-
ত্রয়োদশ সংসদে তা বেড়ে হয়েছে ৯১.২৫ শতাংশ
অন্যদিকে, দ্বাদশ সংসদে স্বল্প সম্পদের বিজয়ীর হার ছিল ৩.০১ শতাংশ। ত্রয়োদশ সংসদে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৬৭ শতাংশে।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসদে উচ্চ সম্পদধারী প্রতিনিধিদের উপস্থিতি বাড়ছে, আর স্বল্প সম্পদের প্রতিনিধিত্ব ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে শীর্ষ সম্পদশালী ১০ জনের তালিকাও প্রকাশ করেছে সুজন।
তালিকার শীর্ষে আছেন শরীয়তপুর-১ আসন থেকে বিএনপি নির্বাচিত সাঈদ আহমেদ। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১১৯৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার ১১০ টাকা।
অন্য সম্পদশালী বিজয়ীরা হলেন—
-
আবদুল আউয়াল মিন্টু, ফেনী-৩ (বিএনপি) — ৯৪৬,৮১,৪৬,৮৪৭ টাকা
-
জাকারিয়া তাহের, কুমিল্লা-৮ — ৭৭০,৮৯,১৭,৭৯৪ টাকা
-
গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, বগুড়া-৫ — ৬১৩,৫৬,৮৫,৯৯৭ টাকা
-
মোঃ সফিকুর রহমান (কিরন), শরিয়তপুর-২ — ৫৫৭,৬৪,৯১,৪৯০ টাকা
-
ফখর উদ্দিন আহমেদ, ময়মনসিংহ-১১ — ৪৬৫,১৪,৪৫,৯৪২ টাকা
-
নাসের রহমান, মৌলভীবাজার-৩ — ৩৮০,৬৪,৭৬,৬৬৯ টাকা
-
মোঃ জালাল উদ্দিন, চাঁদপুর-২ — ৩৬৪,১২,২০,১০৬ টাকা
-
মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা-৮ — ৩২৫,৯৪,৮৩,২৬৬ টাকা
-
স্বতন্ত্র প্রার্থী মোঃ আবদুল হান্নান, চাঁদপুর-৪ — ৩১৮,১৮,৪২,৪২৮ টাকা
সুজনের উপস্থাপিত তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, জাতীয় সংসদে ধনীদের আধিপত্য আরও দৃশ্যমান হচ্ছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্য থাকলেও, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চ সম্পদধারীদের হার অনেক বেশি।
এই প্রবণতা ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো ও সামাজিক ভারসাম্যের ওপর কী প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

