স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময় তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে সরকার। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠান।
চিঠিতে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
চলতি বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায়। অতীতে কয়েকটি দেশের ক্ষেত্রে উত্তরণ পেছানো বা স্থগিত হওয়ার নজির রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালে সিডিপির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। ২০২১ সালের সুপারিশ অনুযায়ী ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বের হওয়ার কথা থাকলেও কভিড-১৯ অতিমারির কারণে তা দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়।
সরকার জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ একের পর এক সংকটে উত্তরণের প্রস্তুতি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়েছে—
-
কভিড-১৯–এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
-
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং জ্বালানি ও খাদ্যের বাজারে অস্থিরতা
-
বৈশ্বিক আর্থিক সংকট
-
মধ্যপ্রাচ্য ও লোহিত সাগর অঞ্চলের সংঘাত
-
বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে—
-
আর্থিক খাতে অনিয়ম
-
গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের প্রভাব
-
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিষ্পন্ন থাকা এবং এ খাতে জাতীয় বাজেটের বড় বরাদ্দ
চিঠিতে বলা হয়েছে, এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বেড়েছে।
মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে দারিদ্র্য হ্রাসের ইতিবাচক প্রবণতা উল্টো দিকে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের মতে, এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি উত্তরণ কৌশলের (এসটিএস) অগ্রাধিকারমূলক কাজ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়ের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে সংকট মোকাবিলায়।
এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে চিঠিতে। তৈরি পোশাক খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের আশঙ্কা—এসব কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকারের আশঙ্কা, বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী উত্তরণ হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য হ্রাসে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। গত বছরের আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ, এফবিসিসিআইসহ ১৬টি সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০৩২ সালে উত্তরণের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
তাদের মতে, এলডিসির জন্য থাকা শুল্ক ও বাজার সুবিধা উঠে গেলে বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্প বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো আবেদন করেনি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবে সরকার বলছে, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি।
ইআরডি সচিব চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, সময় বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, প্রয়োজনীয় সংস্কার জোরদার করা এবং উত্তরণের প্রস্তুতি কাঠামোবদ্ধভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।
এখন দৃষ্টি জাতিসংঘের সিডিপি ও সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের দিকে—বাংলাদেশ কি অতিরিক্ত সময় পাবে, নাকি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এগোবে উত্তরণের পথে।

