শর্ষে উৎপাদনে দেশের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে সিরাজগঞ্জ। জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও উর্বর মাটিই এই সাফল্যের মূল কারণ বলে মনে করছেন কৃষিবিদেরা।
সিরাজগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে দেশের বৃহত্তম বিল চলনবিল। বর্ষায় বিলের পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর শুষ্ক মৌসুমে পানি সরে গেলে পলিমাটিতে ভেসে ওঠা জমিতে শুরু হয় ফসলের আবাদ। এই পলিমাটিই শর্ষে চাষের জন্য জমিকে বিশেষভাবে উপযোগী করেছে। ফলে জেলা সদর থেকে উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও তাড়াশ—সবখানেই এখন হলুদ ফুলের সমারোহ।
ফলনে কেন এগিয়ে:
চলতি অর্থবছরে সিরাজগঞ্জে ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে শর্ষে চাষ হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা আশা করছেন, উৎপাদন দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার টনে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এ জেলায় উৎপাদন ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার টন। একই সময়ে সারা দেশে মোট উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ টন!
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা জানান, সিরাজগঞ্জে শর্ষের বাজারমূল্য ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার মধ্যে। পাশাপাশি শর্ষে ফুলের মধু সংগ্রহেও জেলাটি এগিয়ে। এবার ৪ লাখ ৪ হাজার কেজি মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, যার বাজারমূল্য ১৩ থেকে ১৪ কোটি টাকা।
গত বছর সংগ্রহ হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ কেজি মধু। এবার ২৫৮টি প্রতিষ্ঠান শর্ষে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করছে। একক উপজেলা হিসেবে উল্লাপাড়া শীর্ষে রয়েছে। সেখানে প্রায় ২৪ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে শর্ষে চাষ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চলনবিলের পলিমাটি এই অঞ্চলে ফলন বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।
সিরাজগঞ্জের পর শর্ষে উৎপাদনে এগিয়ে আছে টাঙ্গাইল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সেখানে উৎপাদন ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার টন। তৃতীয় অবস্থানে রাজশাহী, উৎপাদন প্রায় ৯৭ হাজার টন।
চতুর্থ স্থানে মানিকগঞ্জ, উৎপাদন ৯২ হাজার টন। এরপর রয়েছে নওগাঁ, উৎপাদন ৮৮ হাজার টন।
শীর্ষ পাঁচ জেলার মোট উৎপাদন ৫ লাখ ২৪ হাজার টন, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় এক–তৃতীয়াংশ। এসব অঞ্চলে শীতল ও শুষ্ক আবহাওয়া এবং দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি ভালো ফলনের জন্য উপযোগী।
গত তিন বছরে দেশে শর্ষের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন। ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১ লাখ ৬৩ হাজার টনে দাঁড়ায়। আর ২০২৩–২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ১৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়।
আমন ও বোরো মৌসুমের মাঝের স্বল্প সময়ে পতিত জমিতে শর্ষে চাষ করা হয়। দ্রুত ফলনশীল জাত উদ্ভাবন এতে গতি এনেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত ‘বারি সরিষা-২০’ জাত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। মাত্র ৮৫ দিনেই ফসল তোলা যায়।
এই জাত সম্প্রসারণে সহায়তা করছে ‘পার্টনার’ প্রকল্প। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্প থেকেও সার ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, শর্ষের পাশাপাশি দুই মৌসুমের ধানের বীজও বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
দেশে উৎপাদিত শর্ষের বড় ক্রেতা তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বোতলজাত শর্ষের তেলের বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এসিআই, প্রাণ, সিটি গ্রুপ, স্কয়ার, ফ্রেশ ও ওরিয়ন গ্রুপ।
উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন জাতের সম্প্রসারণ ও বাজার চাহিদা—এই তিনের সমন্বয়ে শর্ষে চাষে দেশের শীর্ষে অবস্থান আরও শক্ত করেছে সিরাজগঞ্জ।

