মানুষের মধ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া প্রায় ৭৫ শতাংশ সংক্রামক রোগই প্রাকৃতিকভাবে প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। শুধু তাই নয়, পরিবেশগত কারণও রোগ বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ও মহামারি মোকাবিলার জন্য সরকার ‘ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ অবলম্বন করতে যাচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা জোরদারে নেওয়া হবে ‘স্ট্রেংদেনিং হেলথ ইমারজেন্সি প্রিভেনশন, প্রিপেয়ার্ডনেস, রেসপন্স অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স উইথ ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক প্রকল্প। প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংক।
প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে যৌথভাবে কাজ করবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস)। এ সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে অনুমোদনের জন্য। সূত্র জানিয়েছে, আগামী বুধবার প্রস্তাবটির ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইস) সভা অনুষ্ঠিত হবে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ:
সরকারের নতুন ‘ওয়ান হেলথ অ্যাপ্রোচ’ প্রকল্পে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের স্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ এবং দ্রুত সাড়া প্রদানে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৭০ শতাংশ রোগের প্রাদুর্ভাব সাত দিনের মধ্যে শনাক্ত এবং তিন দিনের মধ্যে ৭০ শতাংশ ল্যাব পরীক্ষার ফলাফল দেওয়া হবে। এছাড়া সরকারি বিএসএল-২ ল্যাবরেটরির ৮০ শতাংশ এবং বিএসএল-৩ ল্যাবরেটরির ১০০ শতাংশকে জৈব নিরাপত্তা (বায়োসেফটি) প্রত্যয়ন দেওয়া হবে।
জরুরি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৪৫টি জেলায় এপিডেমিওলজিক্যাল ইউনিট স্থাপন করা হবে। স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য গঠন করা হবে ১৮২টি র্যাপিড রেসপন্স টিম, এবং ৫০টি উপজেলাকে প্রস্তুত করা হবে। ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ব্যবস্থা উন্নত করা হবে। প্রাণীস্বাস্থ্য খাতে ৮০ শতাংশ বেওয়ারিশ কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হবে এবং পাঁচটি প্রাণীরোগ-মুক্ত অঞ্চল গঠন করা হবে।
এটি নতুন উদ্যোগ নয়। বাংলাদেশে ২০০৭ সালে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাবের পর মানব, প্রাণী ও পরিবেশ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ওয়ান হেলথ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। পরে এই উদ্যোগকে আরও সুসংগঠিত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি এবং ওয়ান হেলথ সেক্রেটারিয়েট প্রতিষ্ঠা করা হয়।
নজরদারি ও প্রস্তুতি শক্তিশালীকরণে ‘ওয়ান হেলথ’ উদ্যোগ:
সরকারের ওয়ান হেলথ স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য নজরদারি ও মহামারি মোকাবিলার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ১১টি মূল উপাদান থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে শাসনব্যবস্থা, কর্মীবাহিনী উন্নয়ন, গবেষণাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, মহামারি প্রস্তুতি, সমন্বিত নজরদারি, খাদ্য নিরাপত্তা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সুরক্ষা।
প্রকল্পের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ওয়ান হেলথ সার্ভেল্যান্স ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা (বিওএইচএসইডব্লিউএস) প্রতিষ্ঠা করা হবে। এটি জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য একত্রিত করে রিয়েল-টাইম রোগ শনাক্তকরণ ও বিশ্লেষণ করবে। পাশাপাশি ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক, মলিকুলার ডায়াগনস্টিক, জৈব নিরাপত্তা ও ল্যাব ইনফরমেশন সিস্টেমকে শক্তিশালী করা হবে। এপিডেমিওলজি ও রোগ নজরদারি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ ও স্যান্ডউইচ পিএইচডি প্রোগ্রামও চালু করা হবে।
ওয়ান হেলথ বাংলাদেশ-এর সায়েন্টিফিক সেক্রেটারি ড. এম মুশতাক হোসেন জানান, সংক্রামক রোগ ও সম্ভাব্য মহামারি মোকাবিলায় প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়েই সংক্রমণ শনাক্ত করা গেলে মহামারি বিস্তার রোধ সম্ভব। প্রকল্পে লক্ষ্য ধরা হয়েছে ‘৭-১-৭’ কাঠামো—সাত দিনের মধ্যে রোগ শনাক্তকরণ, এক দিনের মধ্যে রিপোর্টিং এবং সাত দিনের মধ্যে কার্যকর প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা। তিনি আরও বলেন, মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ—এই তিন খাতকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা না করলে কার্যকরভাবে মহামারি প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
প্রকল্পের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থায় জাতীয় সার্জ ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি, জরুরি অপারেশন সেন্টার (ইওসি) নেটওয়ার্ক গঠন, র্যাপিড রেসপন্স টিম প্রতিষ্ঠা এবং জরুরি সরবরাহের মজুত তৈরি করা হবে। পাশাপাশি এএমআর নিয়ন্ত্রণ, জুনোটিক রোগ প্রতিরোধ, খাদ্য নিরাপত্তা উন্নয়ন, ভেক্টরবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ, পশু টিকাদান কর্মসূচি এবং ডিজিটাল পশু ট্র্যাকিং সিস্টেমও চালু করা হবে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, সিমুলেশন অনুশীলন, তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ করা হবে।

