বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি তেল–গ্যাস কোম্পানিগুলোর জন্য এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে শ্রমিকদের মুনাফার অংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার ঠিক এক দিন আগে তড়িঘড়ি করে শ্রম বিধিমালা সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বিদেশি তেল–গ্যাস কোম্পানিতে কর্মরত শ্রমিকদের মুনাফার ৫ শতাংশ পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন শ্রমিকনেতারা। তাঁদের অভিযোগ, শ্রমিকদের অধিকার উপেক্ষা করে একতরফাভাবে বিধিমালা বদলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। তাঁরা দ্রুত এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি শ্রমিকদের বকেয়া লভ্যাংশ পরিশোধে কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়ার আহ্বান জানান।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপি সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। তার আগের দিন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিদেশি তেল–গ্যাস কোম্পানির জন্য সুবিধাভোগী মুনাফা অংশগ্রহণ কেন্দ্রীয় তহবিল গঠনের লক্ষ্যে শ্রম বিধিমালা সংশোধনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। অথচ প্রচলিত শ্রম আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের লভ্যাংশ অংশগ্রহণ তহবিলে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগকারী আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো, যারা তেল ও গ্যাসের মিশ্রণ, পরিশোধন, শোধন বা খনি ও খনিজসম্পর্কিত কাজে যুক্ত, তারা নিট মুনাফার দেড় শতাংশ তহবিলে জমা দেবে। এই তহবিলের মোট অর্থের ৮০ শতাংশ সুবিধাভোগী হিসাবে রাখা হবে। বাকি ২০ শতাংশ আপত্কালীন কল্যাণ তহবিলে জমা থাকবে।
সুবিধাভোগী হিসাব থেকে নির্দিষ্ট অংশ সেইসব কর্মীদের মধ্যে সমানভাবে বিতরণ করা হবে, যাদের চাকরির বয়স কমপক্ষে ৯ মাস পূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে আপত্কালীন তহবিলের অর্ধেক অর্থ দুর্ঘটনায় মৃত্যু, স্থায়ী অক্ষমতা বা অঙ্গহানির ক্ষেত্রে এককালীন সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে এটি বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হবে। অবশিষ্ট অর্ধেক অর্থ শ্রমিককল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে জমা হবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার একতরফাভাবে শ্রমিকস্বার্থবিরোধী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের মুনাফার অংশ দিচ্ছে। এখন যদি কিছু কোম্পানিকে আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে অন্যরাও একই দাবি তুলবে। এতে শ্রমজীবী মানুষ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি আরও বলেন, লভ্যাংশ প্রদান মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
মার্কিন তেল–গ্যাস কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ এবং সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রিসএনার্জির মালিকানাধীন টাল্লো বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের ৫ শতাংশ লভ্যাংশ না দেওয়ায় জটিলতায় রয়েছে। এ নিয়ে কোম্পানি ও শ্রমিক—দুই পক্ষই উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে।
শেভরন বাংলাদেশ ও টাল্লো বাংলাদেশের কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারা জানান, ২০১৩ সালের পর শেভরন বাংলাদেশ লভ্যাংশ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শ্রমিকেরা হাইকোর্টে রিট করেন। ২০২৪ সালে আদালত শ্রমিকদের পক্ষে রায় দেন। পরে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে টাল্লো বাংলাদেশের শ্রমিকেরা ২০২১ সালে লভ্যাংশ না পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। গত বছরের এপ্রিলে আদালত তাঁদের পক্ষেই রায় দেন। এরপর সেই রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল করে কোম্পানিটি।
শেভরন বাংলাদেশ কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মোস্তফা সোহেল বলেন, কোনো বিশেষ পক্ষের আগ্রহে তড়িঘড়ি করে এই বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন ছিল। সেখানে পরাজয়ের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আইন পরিবর্তনের পথ নেওয়া হয়েছে। তিনি দ্রুত এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান।
টাল্লো বাংলাদেশ কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রনজিৎ কুমার নন্দী বলেন, আইনে থাকা সুবিধা কমিয়ে দেওয়া বেআইনি। তাঁর অভিযোগ, বিদেশি একটি কোম্পানির চাহিদা পূরণে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে গোপনে এই পরিবর্তন করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে গত ২ ফেব্রুয়ারি ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী শ্রম উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। সভায় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৪–এ সাতটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিড ডকুমেন্ট কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউ জমা দেয়নি। তিনি জানান, বিড জমা না দেওয়ার পেছনে চারটি কারণ রয়েছে। এর একটি হলো শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত লভ্যাংশ তহবিল। তিনি প্রস্তাব করেন, শতভাগ বৈদেশিক বিনিয়োগকারী কোম্পানির ক্ষেত্রে এই অনুদানের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হোক। তবে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি রাজেকুজ্জামান রতন ও বাবুল আখতার এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত সভায় নিট মুনাফার দেড় শতাংশ অর্থ দিয়ে নতুন তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
এই সভার পর শেভরন বাংলাদেশ কর্মচারী ইউনিয়ন হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের বেঞ্চ গত সোমবার সংশোধিত বিধিমালাটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন।
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় এই সংশোধন করেছে। তিনি জানান, এ নিয়ে কোনো পক্ষ থেকে দাবি বা প্রশ্ন উঠলে বর্তমান সরকার তা বিবেচনা করবে।

