দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে গঠিত এই তহবিল তিন বছর ঘূর্ণায়মান ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে এই অর্থ পাবে এবং সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ সুদের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দেওয়া চামড়া শিল্পের জন্য এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে শুধু কম সুদের ঋণ দিলেই খাতটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান।
নতুন তহবিল থেকে নতুন ট্যানারি ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন কারখানা স্থাপন, বিদ্যমান কারখানা সম্প্রসারণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা, কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জন্য শীতল সংরক্ষণাগার নির্মাণ, বর্জ্য শোধনাগার, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি স্থাপনে ঋণ পাওয়া যাবে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় সনদ অর্জন এবং কারখানার আধুনিকায়নেও এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। ফলে উৎপাদনের মান উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের ইতিহাস কয়েক দশকের। দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৮ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়, যা দেশের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়।
তবে পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকা, লবণের সংকট, অপরিকল্পিত পরিবহন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়ার মান নষ্ট হয়। ফলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশিত মূল্য পান না।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো মূলত কম দামের কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে অনেক দেশ একই কাঁচামাল ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ও অন্যান্য ব্র্যান্ডেড পণ্য তৈরি করে অধিক মুনাফা অর্জন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য শোধনাগার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতার একটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পরিবেশগত মানের সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় দেশের অধিকাংশ ট্যানারি এখনো সেই মান অর্জন করতে পারেনি। ফলে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা বাংলাদেশি চামড়া এড়িয়ে যান অথবা কম দামে কিনে থাকেন।
যদিও নতুন অর্থায়ন তহবিলে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনের জন্য ঋণের সুযোগ রাখা হয়েছে, তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি অবকাঠামো দুর্বল থাকলে শুধু উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না।
এই তহবিলে নতুন চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা, নতুন চামড়াজাত পণ্য কারখানার জন্য ২০ কোটি টাকা এবং আধুনিকায়নের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ রয়েছে।
তবে ব্যাংকগুলো সাধারণত জামানত, আর্থিক নথিপত্র ও পরিবেশগত অনুমোদন রয়েছে—এমন বড় প্রতিষ্ঠানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারী এবং ছোট উৎপাদনকারীরা বাস্তবে এই অর্থায়ন কতটা পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন না হলে বড় প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে, আর প্রকৃত প্রয়োজন থাকা ছোট উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়বেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই খাতকে এগিয়ে নিতে কাঁচা চামড়া উৎপাদনকারী এলাকায় আধুনিক সংগ্রহ ও সংরক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা, মান নির্ধারণের স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু করা, শ্রমিকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দেশীয়ভাবে প্রয়োজনীয় উপকরণ উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে নতুন নকশা, প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতির উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল নিঃসন্দেহে চামড়া শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি বিনিয়োগ ব্যয় কমাবে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে উৎসাহ দেবে। তবে শুধু স্বল্পসুদের ঋণ দিয়ে এই খাতের দীর্ঘদিনের সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
চামড়ার গুণগত মান সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশগত অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে তবেই এই তহবিল প্রকৃত অর্থে দেশের চামড়া শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় স্বল্পসুদের ঋণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি বৃদ্ধি ও শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

