রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে এখন এক নতুন দৃশ্য। অফিসযাত্রী, গৃহিণী, বৃদ্ধ, তরুণ—সবার মুখে একই কথা: “কয়েকশ’ টাকা বাঁচাতে হবে।” বাজারের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে ৩০০ টাকা যেন ছোট অঙ্ক নয়, বরং এক পরিবারের কয়েক দিনের সবজির খরচ। আর সেই টাকাটা বাঁচাতেই রাজধানীর মানুষ গড়ে তিন ঘণ্টা করে দাঁড়িয়ে থাকছেন টিসিবির ট্রাকের পেছনে।
শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিলে সপ্তাহের বাকি ছয় দিন কাকডাকা ভোর থেকেই শুরু হয় এই অপেক্ষা। দুপুরের রোদ, বিকেলের ধুলা, কখনও হালকা বৃষ্টি—কিছুই যেন মানুষকে থামাতে পারছে না। লাইনে দাঁড়ানো মানুষের চোখে এক ধরনের ক্লান্তি, কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রত্যাশা—আজ যেন পণ্য পাওয়া যায়।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বর্তমানে সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে পাঁচটি নিত্যপণ্যের একটি প্যাকেজ বিক্রি করছে ৫৯০ টাকায়। প্যাকেজে থাকছে দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, এক কেজি ছোলা এবং আধা কেজি খেজুর।
দাম নির্ধারণ করা হয়েছে—প্রতি লিটার তেল ১১৫ টাকা, প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা, মসুর ডাল ৭০ টাকা, ছোলা ৬০ টাকা এবং আধা কেজি খেজুর ৮০ টাকা। সব মিলিয়ে ৫৯০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে পুরো প্যাকেজ।
একই পণ্য বাজার থেকে কিনতে গেলে খরচ পড়ে ৯০০ থেকে ৯২০ টাকা। অর্থাৎ একজন ক্রেতা অন্তত ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা সাশ্রয় করতে পারছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সাশ্রয়ই মানুষকে টানছে লাইনে।
রাজধানীর প্রেস ক্লাব, সচিবালয় এলাকা, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরার বিভিন্ন স্থানে সকাল থেকেই লাইনের দৃশ্য চোখে পড়ে। ট্রাক পৌঁছানোর আগেই ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ দাঁড়িয়ে যান। সময় যত গড়ায়, লাইন তত লম্বা হয়।
টোকেন সংগ্রহ থেকে শুরু করে পণ্য হাতে পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় দেখা যায় ধাক্কাধাক্কি, অস্থিরতা এবং কখনও বিশৃঙ্খলা। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন।
চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় অনেকেই আশঙ্কা করেন—সবাই পণ্য পাবেন না। ফলে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। ট্রাক কখনও স্থান পরিবর্তন করলে মানুষ দৌড়ে পেছনে ছুটে যান। এমনকি চলন্ত ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের ৬/সি রোডে এমনই এক ঘটনায় এক নারী ক্রেতা আহত হন। অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে ট্রাক স্থান পরিবর্তন করলে কয়েকজন পণ্য পাওয়ার আশায় চলন্ত ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়েন। সেখান থেকে ছিটকে পড়ে ওই নারী আহত হন।
টিসিবির মুখপাত্র শাহাদত হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে ৪৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য বরাদ্দ থাকলেও লাইনে দাঁড়ান তার দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ।
রমজান উপলক্ষে চাহিদা আরও বেড়েছে। বরাদ্দ বাড়ানো গেলে ভোগান্তি কমানো সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগে টিসিবির লাইনে প্রধানত নিম্নআয়ের মানুষ দেখা যেত। এখন চিত্র বদলেছে। স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী, এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারও লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সচিবালয়ের কর্মচারীরাও যুক্ত হয়েছেন এই সারিতে।
জিরোপয়েন্ট এলাকায় ডিলার কর্মচারী রমজান আলী জানান, “আগে শুধু গরিব মানুষ দেখা যেত, এখন অনেক মধ্যবিত্তও লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।”
যাত্রাবাড়ির কাজলা বাসস্ট্যান্ডে ৭০ বছর বয়সী আব্দুল হক লাইনে দাঁড়িয়ে। তিনি বলেন, “ছেলে অফিসে গেছে। নাতির স্কুল বন্ধ। ছেলে ফোন করে বলল টিসিবির পণ্য নিতে। ৫৯০ টাকায় পেলে অন্তত ৩০০ টাকা বাঁচে।”
এই ৩০০ টাকাই এখন তার পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত ২০ দিনব্যাপী এই ট্রাক সেল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে ভিড়, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে ক্রেতারা নিরাপত্তা জোরদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ লাইন ও কার্যকর টোকেন ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
রাজধানীতে এখন টিসিবির ট্রাক মানেই শুধু সস্তা পণ্য নয়, বরং কয়েকশ’ টাকা সাশ্রয়ের লড়াই। এই লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দিনমজুর থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী পর্যন্ত। ৩০০ টাকা বাঁচাতে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা—এই চিত্র শুধু বাজারদরের বাস্তবতাই নয়, বরং মানুষের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।
আপনি চাইলে আমি এটিকে আরও বিশ্লেষণধর্মী বা আরও আবেগঘন ফিচার স্টাইলে সাজিয়ে দিতে পারি।

