মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য জ্বালানি আমদানিকারক দেশের মতো বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বড় একটি অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানির মজুত ধরে রাখা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এখন বিকল্প উৎস খুঁজতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ব্রুনেই ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকেও তেল আমদানির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকার স্পট মার্কেট থেকেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনার জন্য বিকল্প উৎস অনুসন্ধান করছে। একই সঙ্গে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চেয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশকে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারত ও চীন যৌথভাবে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে পৃথক বৈঠক শেষে দুই দেশের রাষ্ট্রদূতরা এ বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন সাংবাদিকদের বলেন, জ্বালানি সমস্যা সমাধানে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সহায়তা দিতে চীন আগ্রহী বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার অতিরিক্ত জ্বালানি সহায়তা চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে চিঠি দিয়েছে। গত ১১ মার্চ সচিবালয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠি তিনি গ্রহণ করেছেন এবং দ্রুত তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করতে হবে। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনেই কিংবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আপৎকালীন জ্বালানি হিসেবে এলএনজি আনা যেতে পারে। তবে এসব উৎস দূরে হওয়ায় আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে।
তার মতে, বৈশ্বিক সরবরাহ কমে গেলে জ্বালানি বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। তখন যে দেশ আগে কার্গো নিশ্চিত করতে পারবে, তারাই সুবিধা পাবে।
বর্তমানে ইউরোপে শীত শেষ হওয়ায় এলএনজির চাহিদা কিছুটা কমেছে। তবে জাপান, চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত বিশ্বের বড় এলএনজি আমদানিকারক হওয়ায় বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্ক না ছড়িয়ে সরকার এখন জ্বালানির মজুত বিষয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখা জরুরি।

