বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় টেলিভিশন ব্যবহারকারী দেশ। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় বাজারের সম্প্রচার ও ডিজিটাল কনটেন্ট শিল্প এখনও কাঠামোগতভাবে অনুন্নত। এর ফলে সরকার প্রতি বছর আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
দেশের অধিকাংশ এলাকায় বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কোনো নিয়ন্ত্রণ বা বাণিজ্যিক অনুমোদন ছাড়াই সম্প্রচারিত হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্রাহকসংখ্যা কম দেখানো, লাইসেন্সবিহীন ওটিটি এবং ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে লাইভ চ্যানেল সম্প্রচার, এবং অবৈধ সেট-টপ বক্সের বিস্তার নজর কাড়ছে। এতে শুধু রাজস্ব হ্রাস নয়, বাজারে অসম এবং অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। এই সংকটের মূল কারণ হলো দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণের অভাব, বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার অনুপস্থিতি এবং কনটেন্ট বিতরণ পর্যায়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যর্থতা।
দেশের কেবল টেলিভিশন ইকোসিস্টেমের বড় অংশ এখনও অ্যানালগ পদ্ধতিতে চলে। বিল সংগ্রহের এই অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রকৃত গ্রাহক সংখ্যা শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে। ফলে গ্রাহক সংখ্যা কম দেখানো বা আয় গোপন করার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও কেবল অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) তাদের সদস্যদের মধ্যে বাজার শৃঙ্খলা বা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। এর ফলেই বৈধ অপারেটররা আর্থিক ও বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, এবং এনবিআরের কর সংগ্রহেও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাইসেন্সবিহীন ওটিটি অ্যাপ এবং আইএসপি প্ল্যাটফর্মগুলো সরাসরি দেশি-বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচার করছে। এটি ডিজিটাল পাইরেসি এবং লাইসেন্স লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ। ২০০৬ সালের কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক অপারেশন আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে লিনিয়ার চ্যানেল বিতরণের অধিকার কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফিড, কেবল এবং ডিটিএইচ অপারেটরদের দেওয়া হয়েছে। সমস্যা আইনের অভাবে নয়, বরং আইন প্রয়োগে অনীহা বা ব্যর্থতায়।
বিশ্বজুড়ে কেবল, ডিটিএইচ এবং ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ওটিটি সেবার বিস্তার সেই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিজিটাল বিতরণ বৃদ্ধির কারণে অনেক দেশে পে-টিভির প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা ভিন্ন। দেশজুড়ে ৯০ শতাংশ কেবল নেটওয়ার্ক এখনও অ্যানালগ। সেগুলো ডিজিটালাইজড এবং আইনি ও বাণিজ্যিক কাঠামোর আওতায় আনলে বাংলাদেশ হতে পারে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পে-টিভি বাজারের অন্যতম।
প্রস্তাবিত সম্প্রচার অধ্যাদেশ, ২০২৬ এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো সমাধানের সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি ২০০৬ ও ২০১০ সালের সংশোধিত আইন এবং বিধিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করলে খাতটি নিয়ন্ত্রিত ও বিনিয়োগযোগ্য শিল্পে পরিণত হবে। এতে গ্রাহক, সম্প্রচারকারী, অপারেটর ও রাষ্ট্র—সকলেই উপকৃত হবে।
সংকট নিরসনের জন্য কিছু সংস্কার অপরিহার্য। প্রথমত, লিনিয়ার চ্যানেল সম্প্রচার হলে যেকোন মাধ্যমেই হোক, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে অনিয়ন্ত্রিত ওটিটি ও আইএসপি প্ল্যাটফর্মের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কেবল নেটওয়ার্ককে ‘অ্যাড্রেসেবল ডিজিটাল সিস্টেম’-এর আওতায় আনতে হবে। এতে গ্রাহকসংখ্যা স্বচ্ছ হবে এবং কর ফাঁকি রোধ করা যাবে।
তৃতীয়ত, বাণিজ্যিক অনুমোদন ছাড়া বিদেশি পে-চ্যানেল সম্প্রচারকে ‘অননুমোদিত বিতরণ’ এবং ‘বাণিজ্যিক পাইরেসি’ হিসেবে গণ্য করতে হবে। এতে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সম্প্রচারকারীদের আয় স্থিতিশীল হবে।
চতুর্থত, লিনিয়ার চ্যানেল ও লাইভ অনুষ্ঠান বিতরণ, মিডিয়া স্বত্ব—all কেবল লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হতে হবে। লাইসেন্সবিহীন কনটেন্ট ট্রেডারদের কারণে বাজার বিকৃত হওয়া রোধ করতে হবে।
পঞ্চমত, অবৈধ ওটিটি ও আইএসপির আইপি ফিড ব্লক করতে হবে। পাইরেসি অ্যাপ সম্বলিত সেট-টপ বক্সের আমদানিতে কঠোর কাস্টমস নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও আমদানিকারকদের কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে। বিটিআরসির মাধ্যমে অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা জরুরি।
লাইসেন্স স্থগিত, আর্থিক জরিমানা ও অবৈধ সরঞ্জাম জব্দসহ প্রস্তাবিত সম্প্রচার আইন বাস্তবায়ন করলে বাংলাদেশে সম্প্রচার খাত ২০ হাজার কোটি টাকার সুসংগঠিত শিল্পে রূপান্তরিত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে বিল বাড়ানোর বা নতুন কর চাপানোর প্রয়োজন নেই। শুধু বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। এতে বিএসসিসিএলের স্যাটেলাইট ব্যবহার বাড়বে এবং বিটিআরসির তদারকি শক্তিশালী হবে।
কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন হলে কনটেন্ট ও সেবার মান উন্নত হবে, গ্রাহকের সুরক্ষা জোরদার হবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা উৎসাহিত হবে এবং শিল্পখাতে স্থিতিশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশে দর্শক, কনটেন্ট বা প্রযুক্তির অভাব নেই। বরং অভাব রয়েছে পূর্ণাঙ্গ ও সুষম আইনগত কাঠামো স্থাপন এবং তার কার্যকর প্রয়োগের। সময় এসেছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

