মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হচ্ছে। যুদ্ধের প্রভাব জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়াতে পারে।
বিনিয়োগ কমে যাওয়া, উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঝুঁকি অর্থনীতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস, যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, ফেব্রুয়ারি ২০২৬’ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে সামান্য স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত থাকলেও রাজস্ব আয়, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন ব্যয়ের দুর্বলতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব যুক্ত হলে চ্যালেঞ্জ আরও প্রকট হবে।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে নতুন জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে। যদি দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে মাইক্রো অর্থনীতির স্থিতিশীলতাও ভেঙে পড়বে। তাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগে নতুন চাপ
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, গত চার মাসে ধারাবাহিক বৃদ্ধির পর মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের আয় যেখানে সীমিত, সেখানে দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যয় বেশি হওয়ায় তারা ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে পরিবহন খরচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং শিল্প-কারখানার উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। এসবের সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে, যা মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
বিনিয়োগে ধীরগতি
দেশের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ইতিমধ্যেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমার কারণে বোঝা যাচ্ছে, বেসরকারি খাত প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ করছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আরও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হবে। ফলে নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাতে পারেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যেতে পারে।
রাজস্ব ঘাটতির চাপ বৃদ্ধি
চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে ১২.৯ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। বাকি সময়ে লক্ষ্য পূরণের জন্য সরকারকে ৫৯.৪ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবে অসম্ভব। বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায়ের ঘাটতির কারণে সরকার ব্যাংক খাতের ওপর বেশি নির্ভর করছেন। ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ব্যাংক ঋণ বাড়ার ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানির বড় অংশ ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
উন্নয়ন ধীরগতি ও বৈদেশিক চ্যালেঞ্জ:
দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও উদ্বেগজনক ধীরগতি দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০–২১ শতাংশের মধ্যে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রকল্প প্রস্তুতিতে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বাস্তবায়ন সময় দীর্ঘায়িত হবে।
বৈদেশিক খাতে মিশ্র চিত্র
বৈদেশিক খাতে অবস্থার মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে, আর প্রবাসী আয়ও স্থিতিশীল রয়েছে। জানুয়ারিতে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স প্রায় ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় শ্রমবাজারে অস্থিরতা হলে প্রবাসী আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
আরএমজি সেন্টারের সভাপতি মেহেদী মাহবুব বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই অঞ্চল রেমিট্যান্স ও শ্রমবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ তীব্র হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি দুর্বল হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, সেখানে অস্থিরতা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। পাশাপাশি আকাশপথ বন্ধ হলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, “যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদি হোক বা দীর্ঘমেয়াদি—যে পরিস্থিতিই হোক না কেন, অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলায় সরকার পরিকল্পনা করছে।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর ও শুল্ক কমানোর মতো নীতিগত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যদিও কিছু সূচকে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, তবু ভেতরে ভেতরে একাধিক ঝুঁকি জমা হচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগে দুর্বলতা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি ইতিমধ্যেই অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের অভিঘাত যুক্ত হলে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত এবং কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার ধাক্কায় দেশের অর্থনীতি আবারও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

