রাজশাহী নগরবাসীর জন্য পদ্মা নদীর পানি শোধন করে সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে নেয়া বড় অবকাঠামো প্রকল্পটি আট বছরেও অর্ধেক পথ পাড়ি দিতে পারেনি। সরকারি অর্থায়ন ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণে বাস্তবায়নাধীন দৈনিক ২০ কোটি লিটার পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পটির অগ্রগতি এখনো ৫০ শতাংশের নিচে। দীর্ঘসূত্রতা, ঋণসংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রশাসনিক নানা বাধার কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বারবার পিছিয়েছে।
রাজশাহীর বাসিন্দাদের ঘরে সরাসরি পদ্মার পানি পৌঁছে দিতে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয় কিন্তু অনুমোদনের পর প্রথম চার বছর প্রকল্পের কাজই শুরু করা যায়নি। ঋণ ছাড়ে বিলম্ব, অর্থসংস্থান সমস্যা, অসম্পূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এ বিলম্ব ঘটে। চার বছরের মেয়াদের প্রকল্পটি পরে আরও চার বছর বাড়ানো হলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৩০ শতাংশে। প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, রাজশাহী নগরবাসীর নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে ২০১৮ সালের অক্টোবরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘রাজশাহী ওয়াসার ভূ-উপরিস্থিত পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্প’ অনুমোদন দেয়। সরকার ও চীন সরকারের মধ্যে জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) ভিত্তিতে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলেও শুরুতেই ঋণ ছাড় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় তিন বছর পর, ২০২১ সালের মার্চে চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সঙ্গে রাজশাহী ওয়াসার চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীনা প্রতিষ্ঠানটি ২ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করবে এবং বাকি ১ হাজার ৭৪৮ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।
প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পদ্মা নদীর সারাংপুর পয়েন্টে পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হচ্ছে। পদ্মা থেকে পানি উত্তোলন করে শোধনের পর ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে গোদাগাড়ী থেকে রাজশাহী মহানগরের কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় পানি সরবরাহ করা হবে। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিতে নতুন করে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি বিতরণ লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার পানি শোধন সম্ভব হবে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো অঞ্চলে শতভাগ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হলে রাজশাহী শহরের দীর্ঘদিনের পানির সংকট অনেকটাই কমে আসার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। অনুমোদনের পর দীর্ঘ সময় কাজ শুরু না হওয়া, ঠিকাদারি কাজে ধীরগতি এবং অর্থছাড়ে বিলম্বের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন বারবার পিছিয়েছে। ফলে নগরবাসী এখনো সীমিত সক্ষমতার পুরনো পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে পানির ঘাটতি তীব্র হয়ে ওঠে এবং অনেক এলাকায় ভোগান্তি বাড়ে।
রাজশাহী ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও আশপাশের এলাকায় বর্তমানে জনসংখ্যা ছয় লাখের বেশি। এ বিপুল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানির চাহিদা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ কোটি লিটার কিন্তু ওয়াসা প্রতিদিন সরবরাহ করতে পারে মাত্র ১১ দশমিক ৩ থেকে ১১ দশমিক ৫ কোটি লিটার। ফলে প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে চার কোটি লিটার পানির ঘাটতি থেকে যায়।
রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. পারভেজ মামুদ, যিনি প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন, বলেন রাজশাহীর পানি সরবরাহের বড় অংশই ওয়াসার ওপর নির্ভরশীল। তাঁর ভাষ্য, দৈনিক প্রায় ১৩৫ মিলিয়ন লিটার পানির চাহিদা থাকলেও বর্তমানে ১১৩ থেকে ১১৫ মিলিয়ন লিটার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ভূ-উপরিস্থিত পানি শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে এ ঘাটতি পূরণ করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, বিভিন্ন সংকটের কারণে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ২০১৮ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে এসে। সে সময় সরকারি অর্থায়নের অংশ প্রস্তুত থাকলেও প্রতিশ্রুত ঋণ সময়মতো ছাড় করেনি চীনের এক্সিম ব্যাংক। এ ছাড়া পাইপলাইন বসানোর জন্য জায়গা উচ্ছেদ এবং প্রশাসনিক জটিলতাও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটিয়েছে। বর্তমানে আর্থিক অগ্রগতি ৪৩ শতাংশের বেশি হয়েছে এবং হাতে এখনও প্রায় ১৬ মাস সময় রয়েছে বলে তিনি জানান।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, বর্তমানে পদ্মা নদী থেকে পানি আনার জন্য প্রায় ২৬ কিলোমিটার প্রধান ট্রান্সমিশন পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছে। রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক বরাবর পাইপলাইন বসানোর জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে নগরীর ভেতরে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিতরণ লাইন নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে। গোদাগাড়ীর সারংপুর এলাকায় ইনটেক পয়েন্ট, পানি শোধনাগার এবং বুস্টার পাম্প স্টেশন নির্মাণের প্রাথমিক কাজও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
এদিকে দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় দুটিই কমেছে বলে জানিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থা অর্থছাড় কমিয়ে দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চীন প্রায় ২ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা ঋণ ছাড় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ভবিষ্যতে অর্থছাড়ের গতি বাড়তে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত ওয়াসার বেশিরভাগ প্রকল্পই ঋণের অর্থ ছাড়ের ওপর নির্ভরশীল। রাজশাহী ওয়াসার প্রকল্পটিও শুরুতেই ধাক্কা খায় এবং নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে কাজ শুরু হয়। ফলে প্রকল্পের অগ্রগতি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি আরও বলেন, ওয়াসা প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা প্রায়ই দেখা যায়। এতে প্রকল্প ব্যয়ও বাড়ে। কারণ বিদেশি ঋণ সাধারণত ডলারে নেওয়া হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডলারের মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে। প্রকল্প নেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করাও এ ধরনের বিলম্বের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।
রাজশাহী ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল আলম সরকার বলেন, যৌথ অর্থায়নের প্রকল্প হওয়ায় শুরুতে কিছু জটিলতা ছিল। এখন সেগুলো কাটিয়ে কাজ এগিয়ে চলছে। শোধনাগারের বেজমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে এবং ওপরের কাঠামোর কাজ চলছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় খুব বেশি লাগবে না বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

