দেশে বন্ড লাইসেন্সের বাইরে থাকা রপ্তানিকারকদের জন্য স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহে দীর্ঘদিনের একটি বড় বাধা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে তৈরি পোশাক খাতের বহু কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে নতুন গতি আসতে পারে।
বন্ড লাইসেন্সবিহীন রপ্তানিকারকদের জন্য উদ্যোগ
স্থানীয় উৎস থেকে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এই পরিবর্তন কার্যকর হলে বন্ড লাইসেন্স না থাকা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও স্থানীয় বাজার থেকে সুতা, কাপড় ও আনুষঙ্গিক পণ্য সংগ্রহ করতে পারবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ড লাইসেন্সের আওতার বাইরে রয়েছে, তাদের জন্য বিদ্যমান বাধা দূর করতে রাজস্ব বোর্ড কাজ করছে। তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, প্রয়োজনীয় আইনি সংশোধন শেষ হলে এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করা হবে। এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে একটি সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করা হয়েছে। অনুমোদন মিললে ভ্যাট নীতি বিভাগ থেকে আদেশ জারি করা হবে এবং পরে কাস্টমস বন্ড শাখা নির্দিষ্ট শর্তসহ আরেকটি নির্দেশনা দেবে।
শত শত কারখানার জন্য সম্ভাব্য স্বস্তি
এই উদ্যোগ কার্যকর হলে বন্ডেড লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত এক হাজার একশোর বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব কারখানা মূলত স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করে। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক রপ্তানি প্রায় সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলার। এতে প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কাজ করেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সম্ভাব্য অনিয়ম রোধে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ ও ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে অপব্যবহারের সুযোগ কমে আসবে।
দীর্ঘদিনের দাবি শিল্পমালিকদের
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বহু বছর ধরে এই সমস্যার সমাধান চেয়ে আসছেন। বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী জানান, ২০২১ সালে প্রথম এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, সমস্যার সমাধানে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময়েও কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রায় ১১ মাস আগে সংগঠনের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়ার পর কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা থেমে যায়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রগতি হয়েছে।
তার মতে, সমস্যার সমাধান যদি এখন সম্ভব হয়, তাহলে এত সময় কেন লাগল—এ প্রশ্নও রয়েছে। দীর্ঘদিন প্রক্রিয়াটি আটকে থাকার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।
নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সংকট
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, বন্ড লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মূল ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে অন্য বন্ডেড কোম্পানি থেকে সুতা, কাপড় বা আনুষঙ্গিক পণ্য সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু বন্ড লাইসেন্স না থাকলে সেই সুবিধা পাওয়া যায় না।
রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেক সময় ব্যাংকগুলো নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের জন্য এ ধরনের ঋণপত্র খুলতে চায় না। ফলে তাদের স্থানীয় বাজার থেকে নগদ অর্থে বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়। এ ছাড়া রপ্তানির সময় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কাঁচামালের বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধের প্রমাণ চায়। বছর শেষে ভ্যাট অডিটের সময়ও নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন ছোট উদ্যোক্তারা।
রাজধানীর বাড্ডায় অবস্থিত নিট পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আরএল অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ব্যাংকগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খুলতে রাজি না হওয়ায় খোলাবাজার থেকে নগদ টাকায় বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়। এতে বন্দরে রপ্তানির সময় এবং ভ্যাট অফিসে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তিনি জানান, বাড়তি খরচের চাপের কারণে একসময় তার কারখানায় ১৬০ জন শ্রমিক কাজ করলেও এখন তা কমে প্রায় ১০০ জনে নেমে এসেছে। বিশেষ করে সোয়েটার ও ওভেন পোশাক রপ্তানিকারকেরা এ সমস্যায় বেশি ভুগছেন।
কেন অনেকেই বন্ড লাইসেন্স নেন না
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বন্ডেড গুদাম লাইসেন্স পাওয়া তুলনামূলক কঠিন বলে অভিযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, নির্দিষ্ট আকারের গুদামঘর, প্রশস্ত সড়ক সংযোগ এবং অন্তত এক কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনসহ বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। এসব শর্ত পূরণের পরও আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। কখনো মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগও রয়েছে। এক রপ্তানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বন্ডেড গুদাম লাইসেন্স পেতে বিভিন্ন ধাপে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হতে পারে বলে তিনি শুনেছেন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পোশাক, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ছয় হাজার কারখানা বন্ডেড গুদাম সুবিধার আওতায় রয়েছে এবং তারা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারে। অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৮৭ ধরনের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যার ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, অতীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল অপব্যবহারের আশঙ্কায় সরকার এ ধরনের সুবিধা দিতে সতর্ক ছিল। কারণ, রপ্তানির জন্য আনা কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে বিক্রি হলে একদিকে রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে বৈধ আমদানিকারকেরা প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তবে এখন ই-ভ্যাট ব্যবস্থা এবং কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু হওয়ায় তথ্য আদান-প্রদান সহজ হয়েছে। এসব ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে কাস্টমস, ভ্যাট কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই যাচাই করা যাবে নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলো কোথা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করছে এবং তা শেষ পর্যন্ত রপ্তানিতে ব্যবহার হচ্ছে কি না। এতে ভুয়া রপ্তানি ঘোষণা বা শুল্কমুক্ত কাঁচামালের অপব্যবহারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

