বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও গবেষণার প্রসার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে ১৭০টির বেশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও গবেষণা কার্যক্রম এখনো খুব সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চালু করা হয়েছে ‘হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্প। কাগজে-কলমে এই উদ্যোগ অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং সময়োপযোগী। তবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে প্রকল্পটি এখন নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের মুখে পড়েছে।
পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে, যার মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫০.৯৬ শতাংশ অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার এবং বাকি ৪৯.৪ শতাংশ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগ থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে একটি বড় অগ্রগতি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের বাস্তব চিত্র সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রকল্পটি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের মন্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে যে প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নেই। অন্যদিকে, ইউজিসি বলছে প্রকল্পের অগ্রগতি “মাঝারিমানের সন্তোষজনক”। এই দুই বিপরীত অবস্থান প্রকল্পটির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে এবং একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছে—আসলেই কি সব কিছু ঠিকভাবে এগোচ্ছে?
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে গবেষণা প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষকদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতা ও কম সাইটেশনধারী শিক্ষকদের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, প্রায় ৪০ শতাংশ নির্বাচিত গবেষকের সাইটেশন ১০০-এর নিচে এবং আরও ৪০ শতাংশের সাইটেশন ৫০০-এর কম। এতে করে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য—গবেষণার মান উন্নয়ন—প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। যখন মেধা ও দক্ষতার বদলে অন্য কোনো বিষয় প্রাধান্য পায়, তখন সেই প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে, যেখানে বলা হচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রকল্পের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছে। রিভিউ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকল্প পাইয়ে দেওয়া এবং অর্থ ভাগাভাগির মতো অভিযোগগুলো বিষয়টিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এমনও বলা হচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্প অনুমোদনের পর অর্থ ভাগাভাগির মৌখিক চুক্তি হয়েছে এবং প্রথম ধাপেই প্রায় ১০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি, তবুও এমন অভিযোগের উপস্থিতিই প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের আঘাত দিচ্ছে।
এদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও তাদের অনেকেই এই প্রকল্পে যথাযথ সুযোগ পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি যেসব প্রতিষ্ঠান গবেষণায় দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছে, তারাও প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে প্রকল্প বণ্টনে ভারসাম্য ও ন্যায্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সমস্যা শুধু কোনো একক সিদ্ধান্ত বা ব্যক্তির নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতা এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি, জবাবদিহির অভাব এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব—সব মিলিয়ে একটি বড় প্রকল্প তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পটির দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে এবং ইউজিসির পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, শুধুমাত্র নির্দেশ দিয়ে কি এই সংকট কাটানো সম্ভব? যদি প্রথম পর্যায়ের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার না আনা হয়, তাহলে একই সমস্যা আবারও ফিরে আসার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
হিট প্রকল্প আসলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য একটি বড় সুযোগ ছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পথ তৈরি করা সম্ভব ছিল। কিন্তু যদি এই সুযোগটি অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু একটি প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবশেষে বলা যায়, এই প্রকল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—বাংলাদেশ কি সত্যিই গবেষণাভিত্তিক উন্নয়নের পথে এগোতে চায়, নাকি বড় অঙ্কের প্রকল্প নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চায়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং মেধার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়ার কোনো বাস্তব পথ নেই।

