বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতির কারণে সমস্যার মুখোমুখি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন, বিশেষ করে ইউনেস্কোর বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান, স্পষ্টভাবে দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হার মাত্র ৫৫ শতাংশ, যেখানে নিম্ন মাধ্যমিকের জন্য ৫৪.৭ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য ৫৫.২ শতাংশ। অন্যদিকে মালদ্বীপ, ভুটান, নেপাল ও ভারতের ক্ষেত্রে এই হার অনেক বেশি, যা বাংলাদেশের তুলনায় শিক্ষার মানের পার্থক্য স্পষ্টভাবে দেখায়।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, শিক্ষার মান নষ্ট হওয়ার মূল কারণ দুটি।
প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব। অনেক সময় যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের কারণে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। এমনকি ভুয়া সনদ ব্যবহার করে শিক্ষক হওয়ার ঘটনাও নজর এড়ায়নি।
দ্বিতীয়ত, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের অকার্যকর ব্যবস্থা। সরকার যখন প্রশিক্ষণের জন্য শিক্ষক তালিকা পাঠায়, বিদ্যালয়গুলি প্রায়ই প্রকৃত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পরিবর্তে স্বজনপ্রীতির ভিত্তিতে নাম পাঠায়। ফলে গণিত বা বিজ্ঞান বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষকেরা প্রায়শই সঠিকভাবে তাদের দক্ষতা ব্যবহার করতে পারেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, “শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি সরাসরি শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফলে প্রভাব ফেলছে। বার্ষিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং প্রি-সার্ভিস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ঘাটতির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজি বিষয়ে ৫৯,৭৯১ শিক্ষক রয়েছে, তবে মাত্র ১৬.৯৯ শতাংশেরই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর যোগ্যতা আছে। গণিত বিষয়ে ৬১,৭০৭ শিক্ষক রয়েছে, কিন্তু স্নাতক/স্নাতকোত্তর যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার মাত্র ১৪.৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ, শিক্ষক সংখ্যা থাকলেও তাদের প্রকৃত দক্ষতা শিক্ষার্থীর মান উন্নয়নে যথেষ্ট নয়।
শিক্ষাবিদরা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দিকে জোর দেন। অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, “শিক্ষক যারা সার্টিফিকেট অর্জন করেছেন, তাদের প্রকৃত দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ে পরিচালিত বিএড ডিগ্রির মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিষয়ভিত্তিক কার্যকর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রেণীকক্ষে তার বাস্তব প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। কারণ শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক—দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত না করে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।”
বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্থায়ী উন্নতি শুধুমাত্র সংখ্যার বৃদ্ধি নয়, বরং শিক্ষকের প্রকৃত দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেই সম্ভব। এটি না হলে, ভবিষ্যতের প্রজন্মের শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা কঠিন হবে।

