একসময় শিক্ষক ছিলেন সমাজে জ্ঞান, নৈতিকতা ও নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁদের কথা মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে শুনত, রাষ্ট্র তাঁদের মর্যাদা দিত এবং সমাজ তাঁদের পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখত। কিন্তু দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দুঃখজনকভাবে, সেই অবমূল্যায়নের অনেক চিহ্ন আজও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়ে গেছে।
শিক্ষকের আর্থিক দুরবস্থার একটি বহুল প্রচলিত গল্প এ প্রসঙ্গে মনে করা যেতে পারে। গল্পটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি সেই সময়ের শিক্ষকদের জীবনসংগ্রামের একটি প্রতীকী চিত্র তুলে ধরে। বলা হয়, ব্রিটিশ আমলে এক কর্মকর্তা একটি বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষকের বেতন জানতে চান। বেতনের পরিমাণ শুনে বিস্মিত হয়ে তিনি জানতে চান, এত অল্প আয় দিয়ে শিক্ষক কীভাবে সংসার চালান। শিক্ষক সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাশের তিন পায়ের একটি টেবিল দেখিয়ে বলেন, তাঁর সংসারও ওই টেবিলের মতো তিন পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—এক পা বেতন, এক পা ধারদেনা আর অন্য পা সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা।
গল্পটি হয়তো নির্ভুল ইতিহাস নয়, কিন্তু এর ভেতরে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা হয়েও শিক্ষকরা ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে অবহেলিত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।
শ্রদ্ধা থেকে অবমূল্যায়নের পথে
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় পণ্ডিত, গুরু ও মৌলভিদের সমাজে বিশেষ মর্যাদা ছিল। শিক্ষা তখন শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম ছিল না; জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত হতো। আর সেই দায়িত্বের প্রধান বাহক ছিলেন শিক্ষক।
ব্রিটিশ শাসনের সময় শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও চরিত্রে বড় পরিবর্তন আসে। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের মূল লক্ষ্য ছিল জ্ঞানভিত্তিক স্বাধীনচেতা সমাজ তৈরি করা নয়; বরং প্রশাসনিক কাজে সহায়ক একটি অনুগত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে তোলা। টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলের শিক্ষাভাবনার প্রভাবিত নীতিগুলোর মাধ্যমে শিক্ষা ক্রমেই প্রশাসনিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
এর ফলে শিক্ষার মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি শিক্ষকতার সামাজিক ও নৈতিক গুরুত্বও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ব্রিটিশ আমলে বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতন ছিল অত্যন্ত কম। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের আয় একজন দিনমজুরের উপার্জনের কাছাকাছি ছিল। সরকারি সুবিধা, অবসরকালীন নিরাপত্তা, চিকিৎসা সহায়তা কিংবা সামাজিক সুরক্ষাও অধিকাংশ শিক্ষকের নাগালের বাইরে ছিল।
অন্যদিকে ইউরোপীয় শিক্ষকদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবস্থা। তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি বেতন, আবাসন ও নানা সুযোগ-সুবিধা পেতেন। একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও স্থানীয় শিক্ষকদের পারিশ্রমিক ও সুবিধা ছিল অত্যন্ত সীমিত। শিক্ষা খাতেও ব্রিটিশ শাসনের বৈষম্যমূলক চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
১৯০৪ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়। শিক্ষকদের স্বাধীন চিন্তা, সমালোচনামূলক মত প্রকাশ কিংবা জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের সুযোগও নানা ক্ষেত্রে সীমিত করা হয়েছিল।
তবে স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে বহু শিক্ষক সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ফলে তাঁদের অনেকেই ব্রিটিশ প্রশাসনের সন্দেহ ও নজরদারির মধ্যে পড়েন। কেউ চাকরি হারান, কেউ কারাবন্দি হন, আবার কেউ অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার হন।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার কি এখনো আছে?
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তারপরও প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে—ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের সেই উত্তরাধিকার কি আমরা এখনো বহন করছি?
শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। কিন্তু তাঁদের জীবনমান ও আর্থিক নিরাপত্তায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন কতটা এসেছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক ১৩তম গ্রেডে চাকরি শুরু করেন। তাঁর প্রাথমিক মূল বেতন ১১ হাজার টাকা। অথচ বর্তমান বাজারদরে চার সদস্যের একটি পরিবারের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, পোশাক, সন্তানের শিক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে এই আয় কতটা পর্যাপ্ত, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
ফলে অনেক শিক্ষককে বাড়তি আয়ের পথ খুঁজতে হয় কিংবা ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হয়। এর প্রভাব শুধু শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো পেশাটির প্রতি নতুন প্রজন্মের আকর্ষণকেও কমিয়ে দেয়।
একটি দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণরা যদি শিক্ষকতাকে জীবনের প্রথম পছন্দ হিসেবে না দেখেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়বেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ফল করা অনেক তরুণ প্রশাসন, ব্যাংক, করপোরেট খাত কিংবা বিদেশে কর্মসংস্থানের দিকে বেশি আগ্রহী হন। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকতা পছন্দের পেশা হিসেবে নয়, বরং অন্য সুযোগ না পাওয়ার পর একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এটি ভালো লক্ষণ নয়।
নীতিনির্ধারণে শিক্ষকের কণ্ঠ কোথায়?
শিক্ষকদের আরেকটি বড় সংকট হলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা। শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকার কথা শিক্ষকদের। কিন্তু শিক্ষা নীতি তৈরি, বাজেট বরাদ্দ কিংবা সংস্কার পরিকল্পনার আলোচনায় তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
ফলে অনেক সময় নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তব শ্রেণিকক্ষের পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। যাঁরা প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত ছাড়া একটি কার্যকর শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু আমাদের দেশে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ, অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতি দীর্ঘদিনের।
ফলে অনেক শিক্ষক তাঁদের সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানোর সুযোগ পান না। আর যখন শিক্ষকতার মর্যাদা কমে যায়, তখন সমাজে জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতিও দুর্বল হতে শুরু করে। শিক্ষককে যথাযথ সম্মান না দেওয়া মানে ধীরে ধীরে শিক্ষাকেও কম মূল্য দেওয়া।
এর প্রভাব শ্রেণিকক্ষের বাইরে আরও বিস্তৃত। জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শিক্ষায় বাড়তি বরাদ্দ, কিন্তু কেন্দ্রে থাকতে হবে শিক্ষককে
তবে আশার জায়গাও রয়েছে। বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে এই খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ১.৩৯ শতাংশের তুলনায় বেশি। পাশাপাশি সরকারি শিক্ষা ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।
মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক।
তবে শুধু অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা নতুন পাঠ্যক্রম দিয়ে শিক্ষার মানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বিনিয়োগের কেন্দ্রে শিক্ষককে রাখতে হবে।
ন্যায্য বেতন ও ভাতা, চিকিৎসা সুবিধা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা ছাড়া দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক তৈরি করা কঠিন।
একজন শিক্ষক শুধু একটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। তিনি একটি প্রজন্মের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখেন। তাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ আসলে অনেকটাই নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে, আর সেই শ্রেণিকক্ষের প্রাণশক্তি হলেন শিক্ষক।
শিক্ষার উন্নয়ন চাইলে তাই আগে শিক্ষকতার মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। কারণ শিক্ষককে অবমূল্যায়ন করে কোনো জাতি তার শিক্ষাব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে পারে না।

