একটি শিশু বলাৎকারের শিকার হয়, খবরটি দুদিন গণমাধ্যমে থাকে, সমাজের একাংশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়, অন্য একাংশ বিষয়টি “ধামাচাপা” দেওয়ার চেষ্টা করে, তারপর সব থিতিয়ে যায়। মাস ছয়েক পর আরেকটি মাদ্রাসা, আরেকটি শিশু, একই ঘটনা – শুধু নাম আর জায়গা বদলায়। এই পুনরাবৃত্তি কাকতালীয় নয়। এটি একটি ব্যবস্থার ফলাফল, যে ব্যবস্থা অপরাধীকে রক্ষা করার জন্য অলিখিতভাবে তৈরি হয়ে গেছে।
অপরাধ একজনের, দায় প্রতিষ্ঠানের
যখনই কোনো হুজুরের হাতে শিশু বলাৎকারের ঘটনা প্রকাশ পায়, তখন সমাজের একাংশের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় অস্বীকার করা – “এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা”, “একজন খারাপ মানুষের কাজ, ধর্মকে দোষ দেওয়া যাবে না”, “মাদ্রাসাকে বদনাম করার চক্রান্ত”। এই প্রতিক্রিয়া আসলে অপরাধীকে নয়, অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাটাকেই রক্ষা করে।
সত্যি বলতে, একজন ব্যক্তি বিকৃত মানসিকতার হতেই পারেন এটি কোনো নতুন কথা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই বিকৃত মানুষটিকে বছরের পর বছর শতাধিক শিশুর সরাসরি নাগালের মধ্যে, কোনো তদারকি ছাড়া, কোনো পটভূমি যাচাই ছাড়া, কোনো স্বাধীন অভিযোগ-ব্যবস্থা ছাড়া কে রেখে দিল? উত্তরটা অস্বস্তিকর; প্রতিষ্ঠানটি নিজেই। যে কাঠামো জবাবদিহিতাহীন, সেই কাঠামো অপরাধীর সবচেয়ে বড় সহযোগী হয়ে ওঠে, ইচ্ছায় হোক বা অবহেলায়।
“বেয়াদবি” শব্দটি কীভাবে অপরাধ ঢেকে দেয়
আবাসিক মাদ্রাসার শিশুরা যখন সাহস করে মুখ খোলে, তখন তাদের সামনে দাঁড় করানো হয় এক অদ্ভুত নৈতিক ফাঁদ। তাদের শেখানো হয়, শিক্ষকের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে বেয়াদবি, বড়দের অসম্মান করা মানে গুনাহ। যে শিশু তার নিজের শরীরের ওপর ঘটা সবচেয়ে ভয়ংকর অন্যায়ের কথা বলতে চায়, তাকে উল্টো শেখানো হয় যে সে-ই বরং অন্যায় করছে মুখ খুলে।
এর চেয়ে নিষ্ঠুর কৌশল কমই আছে। ধর্মের নামে শিশুকে নীরব রাখা, অপরাধীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা ধর্মচর্চা হতে পারে না, এটি অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার একটি সুসংগঠিত সামাজিক প্রক্রিয়া। যারা এই নীরবতা জারি রাখেন, তারা জেনে বা না জেনে অপরাধেরই অংশীদার হয়ে যান।
অভিভাবকের অসহায়ত্ব, প্রতিষ্ঠানের নিরাপদ দূরত্ব
দরিদ্র বা এতিম পরিবারের একটি শিশুকে আবাসিক মাদ্রাসায় পাঠানোর সময় অভিভাবক ভরসা করেন একটি ধারণার ওপর–এখানে সন্তান নিরাপদ থাকবে, খাদ্য পাবে, সুশিক্ষা পাবে এবং ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক পরিবেশে বড় হবে। মাসের পর মাস দেখা না হওয়া, যোগাযোগের সীমিত সুযোগ—এসব স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় ধর্মীয় শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে।
কিন্তু এই দূরত্বই অপরাধীর সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুটি জানে না তার অভিযোগ কার কাছে পৌঁছাবে, পৌঁছালেও কী হবে। অভিভাবক জানেন না তার সন্তানের সঙ্গে দৈনন্দিন কী ঘটছে। মাঝখানে থাকা প্রতিষ্ঠান কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয় না কারণ তাকে হতে বাধ্য করার মতো কোনো আইনি কাঠামোই নেই।
রাষ্ট্রের নীরবতা, সমাজের দ্বিচারিতা
এখানে রাষ্ট্রকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো দরকার। দেশে হাজার হাজার আবাসিক মাদ্রাসা চলছে কোনো কেন্দ্রীয় তালিকা, কোনো লাইসেন্সিং ব্যবস্থা বা নিয়মিত পরিদর্শন ছাড়াই। একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন চালাতে যতটা নিয়ন্ত্রক অনুমোদন লাগে, অথচ শত শত শিশুকে রাতভর রাখার মতো একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠান চালাতে তার চেয়ে কম প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি লাগে। এই বৈপরীত্য ই আসলে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের একটি নির্মম প্রতিফলন।
আর সমাজের দ্বিচারিতাও কম দায়ী নয়। আমরা যখন কোনো স্কুল বা কোচিং সেন্টারে শিশু নির্যাতনের খবর পাই, তখন প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার দাবি ওঠে সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু মাদ্রাসার বেলায় একই দাবি তুললেই তাকে “ধর্মবিরোধী” তকমা দেওয়ার আয়োজন শুরু হয়ে যায়। এই দ্বিচারিতা প্রকারান্তরে অপরাধীদেরই সাহস জোগায়।
এখন যা না করলেই নয়
আর “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন—
– প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসার বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও নিয়মিত অঘোষিত পরিদর্শন;
– শিক্ষক নিয়োগে পুলিশ যাচাই ও শিশু সুরক্ষা প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা, ব্যতিক্রমহীনভাবে;
– মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বাইরে থাকা একটি স্বতন্ত্র, শিশুবান্ধব অভিযোগ ব্যবস্থা, যেখানে শিশু ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে;
– অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া বা অভিযুক্তকে অন্যত্র বদলি করে বাঁচিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তি—শুধু অপরাধীর নয়, রক্ষাকারীরও;
– শিশু বলাৎকারের মামলার দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার, যাতে “কিছুই হবে না” ধারণাটি আর কারও সাহসের কারণ না হয়।
একটি শিশুর শরীর কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার বিনিময়যোগ্য বস্তু নয়। যতদিন আমরা “মাদ্রাসার সুনাম” বাঁচাতে গিয়ে একটি শিশুর কান্না চাপা দিয়ে রাখব, ততদিন এই অপরাধ থামবে না—কারণ নীরবতাই তার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। এই নীরবতা ভাঙার দায় ধর্মীয় নেতৃত্ব, রাষ্ট্র ও সমাজ সবার। যে যত জোরে চুপ থাকার পরামর্শ দেয়, বুঝে নিতে হবে সে ততটাই এই অপরাধচক্রের সুবিধাভোগী।

