চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেনি ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর এসব শিক্ষার্থী অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় যাচ্ছে, নাকি পড়াশোনা থেকেই ঝরে পড়ছে—এ বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই শিক্ষা প্রশাসনের কাছে।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। অর্থাৎ উত্তীর্ণদের একটি বড় অংশ একাদশে ভর্তির প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি।
গত বুধবার রাতে প্রকাশিত প্রথম ধাপের ফল অনুযায়ী, আবেদনকারী ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে। অন্যদিকে ১৪ হাজার ৪১৫ জন কোনো আসন পায়নি। জিপিএ-৫ পেয়েও পছন্দের কলেজ না পাওয়ার তালিকায় রয়েছে ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থী।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার অনেক কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিয়েছে। ১১টি কলেজে ভর্তির জন্য কোনো আবেদন জমা পড়েনি। আরও ৪১৬টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন পড়লেও কোনো শিক্ষার্থী সেখানে নির্বাচিত হয়নি। প্রায় ৮০০ কলেজ-মাদ্রাসা পেয়েছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী।
চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তির উপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ হাজার ১৮০টি। সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ২৫ লাখের বেশি আসন রয়েছে। ফলে সব শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও প্রায় ১৫ লাখ আসন খালি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
শহরের নামী কলেজগুলোর চিত্র অবশ্য ভিন্ন। এসব প্রতিষ্ঠানে আসনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি আবেদন পড়েছে। ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে ৯৮১টি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৩২ হাজার ৬৭৮টি। ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ২ হাজার ৩৭৯ আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ৩২ হাজার ৬৪০ জন। ঢাকা সিটি কলেজে ৪ হাজার ২৮০ আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৩১ হাজার ৯৫১টি।
আবেদনের দিক থেকে শীর্ষ তালিকায় থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি বাঙলা কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ ও সরকারি তোলারাম কলেজ।
জিপিএ-৫ পেয়েও ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থী কোনো কলেজে নির্বাচিত না হওয়ার পেছনে মূলত পছন্দের কলেজের সংখ্যা কম দেওয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন ভর্তি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আবেদন করার সময় একজন শিক্ষার্থী সর্বনিম্ন পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি প্রতিষ্ঠানের পছন্দক্রম দিতে পেরেছে। আসনসংখ্যা ও এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে পছন্দের প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ফলে অনেক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী শুধু দুই-তিনটি নামী কলেজ পছন্দ হিসেবে দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একই ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নম্বরের ব্যবধানের কারণে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। পছন্দের তালিকার কোনো প্রতিষ্ঠানেই আসন না পাওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী প্রথম ধাপে নির্বাচিত হয়নি।
তবে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব শিক্ষার্থী একেবারে ভর্তি থেকে বঞ্চিত হবে না। পরবর্তী ধাপে আসন খালি থাকা সাপেক্ষে তাদের নতুন করে প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে গ্রাম ও মফস্সলের কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কয়েকটি কলেজের অধ্যক্ষের ভাষ্য, আশপাশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাসের হার কমে যাওয়ায় স্থানীয়ভাবে একাদশে ভর্তির সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। আবার পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জেলা বা বড় শহরের কলেজে যেতে আগ্রহী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক অধ্যাপকের মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে শহরমুখী প্রবণতা বাড়ছে। স্থানীয় কলেজের পরিবর্তে জেলা বা বড় শহরের তুলনামূলক ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ বাড়ায় গ্রামীণ কলেজগুলোর শ্রেণিকক্ষ ভবিষ্যতে আরও ফাঁকা হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একাদশে ভর্তির পছন্দক্রম অনুযায়ী মাইগ্রেশনের ফল প্রকাশ হওয়ার কথা শনিবার রাত ৮টায়। এরপর ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ভর্তি কার্যক্রম।

