রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সোমবারের মধ্যে মামলা হবে, এমন আশ্বাস পেয়ে রোববার মধ্যরাতে অবস্থান কর্মসূচি থেকে সরে এসেছেন ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকেরা। তবে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার, ছাত্রত্ব বাতিলসহ অন্য দাবিতে তাঁরা এখনো অনড়। ঘটনার তদন্তে দুই সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ।
রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে এই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সেখানে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।

আহত সাংবাদিকদের মধ্যে আছেন দৈনিক আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ্জামান এবং দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম। প্রথমে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। রাত ১০টার দিকে তাঁদের পাঠানো হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
হামলার পরপরই ক্ষুব্ধ সাংবাদিকেরা সেই রাতেই হলের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠিতভাবে মাঠে নামা বলে দিচ্ছে, ক্যাম্পাসের গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টিকে কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের কাছে এটি পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশের প্রশ্নও।
রাত ১০টার পর ঘটনাস্থলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলিম ও অধ্যাপক মামুনুর রশীদ এবং প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা। আন্দোলনরত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। আলোচনার একপর্যায়ে প্রশাসন মামলা করার ঘোষণা দিলে রাত সোয়া একটার দিকে সাংবাদিকেরা কর্মসূচি থেকে সরে আসেন। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা না হলে পরবর্তী কর্মসূচি দেওয়া হবে।
সাংবাদিকদের দাবির তালিকা বেশ বিস্তৃত। তাঁরা চান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হোক এবং সোমবার বেলা ১২টার মধ্যে তাঁদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত করা হোক। অভিযুক্তদের মধ্যে যাঁরা এখনো শিক্ষার্থী, তাঁদের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। যাঁদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে, তাঁদের সনদ বাতিলের দাবিও তোলা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থী নন, এমন অভিযুক্তদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার কথাও বলেছেন তাঁরা। কর্মসূচি থেকে সরে এলেও দাবিগুলো ছাড়েননি, ফলে বিষয়টির নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে রোববার রাতে সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুনুর রশীদ বলেন, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর এভাবে হামলা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনি জানান, সাংবাদিকদের দাবির প্রেক্ষিতে সোমবার হল প্রশাসনের উদ্যোগে মামলা করা হবে। বাকি দাবিগুলো যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, মামলার ক্ষেত্রে প্রশাসন সুনির্দিষ্ট সময় ও উদ্যোগের কথা বলেছে। কিন্তু অন্য দাবিগুলোর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী এগোনো হবে। অর্থাৎ ছাত্রত্ব বাতিল বা সনদ বাতিলের মতো সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ও সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। ফলে সাংবাদিকদের নির্ধারিত সময়সীমা এবং প্রশাসনের প্রক্রিয়াগত প্রতিশ্রুতির মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় ছাত্রদলের অন্তত ১০ জন নেতা-কর্মী অংশ নেন। তাঁদের অভিযুক্ত করা ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি এম আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম এবং সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম। এখন পর্যন্ত এগুলো প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। মামলা হলে এবং তদন্ত এগোলে এসব অভিযোগের সত্যতা আইনি প্রক্রিয়ায় যাচাই হবে।
এদিকে ঘটনার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত শেষ করে কেন্দ্রীয় সংসদে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। রোববার রাতে সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক (সহসভাপতি পদমর্যাদা) জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগ’ পাওয়ার পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্য কেন্দ্রীয় সংসদের দুই সহসভাপতি এ. বি. এম. ইজাজুল কবির রুয়েল ও মনজুরুল আলম। সংগঠনের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নির্দেশনায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তির ভাষা নিয়ে আলাদা আলোচনার সুযোগ আছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার অভিযোগ’ বলা হয়েছে। অথচ ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা সরাসরি হামলার কথা বলছেন, আর চারজন সাংবাদিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সংগঠনের নিজস্ব তদন্ত কমিটি স্বাধীন তদন্তের বিকল্প নয়। সাংবাদিকেরা যে আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা চাইছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত ঘটনার বিচারের মূল পথ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে সোমবার দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মামলা করে কি না, সাংবাদিকদের বেঁধে দেওয়া দুপুর ১২টার সময়সীমার মধ্যে গ্রেপ্তারের কোনো অগ্রগতি হয় কি না এবং ছাত্রদলের কমিটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কী প্রতিবেদন দেয়, তার ওপর নির্ভর করছে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে। মামলা না হলে সাংবাদিকেরা নতুন কর্মসূচিতে যাবেন বলে আগেই জানিয়ে রেখেছেন।

