রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক এবং সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইনকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার সকালে ক্যাম্পাসে ‘আপামর ছাত্র-জনতা’ পরিচয়ে একদল লোক প্রবেশ করে এ ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তবে এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে একদল লোক মিছিল নিয়ে জোর করে উপাচার্যের কার্যালয়ে ঢোকে। তাঁরা উপাচার্য ও সেকশন অফিসারকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ আখ্যা দেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ঢাকার ঠিকাদারদের দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। এরপর দুজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে আগে থেকে লিখে আনা পদত্যাগপত্রে তাঁদের কাছ থেকে জোর করে সই নেওয়া হয়। সই নেওয়ার পর তাঁদের কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সময় উপাচার্যের কক্ষ থেকে কম্পিউটারের সিপিইউ ও সিসিটিভি ফুটেজের যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে পুরো ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সিসিটিভির যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ায় ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার ও উপাচার্যের একান্ত সচিব নাজমুল হোসাইন ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, সকাল ১০টা থেকে উপাচার্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি অনলাইন বৈঠকে যুক্ত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে একদল লোক মিছিল নিয়ে জোর করে কক্ষে ঢোকে। তারা উপাচার্যকে গালিগালাজ করতে থাকে এবং আগে থেকে তৈরি করা পদত্যাগপত্রে সই নেয়। এরপর তাঁকেও সই করতে বাধ্য করা হয়। তিনি রাজি না হলে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন নাজমুল হোসাইন।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের রাজপাড়া থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ফোনে খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। গিয়ে দেখেন উপাচার্যের কক্ষ তালাবদ্ধ। সংঘবদ্ধ কাউকে সেখানে পাননি। এ বিষয়ে কেউ এখনো লিখিত অভিযোগ দেননি বলে জানান তিনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন ওসি।
এ ঘটনায় বেশ কিছু বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। হামলাকারীরা কারা, তাঁদের আসল পরিচয় কী এবং সত্যিই তাঁরা শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষ কি না, তা জানা যায়নি। উপাচার্যের বিরুদ্ধে তোলা ঠিকাদার-সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা নিয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। উপাচার্য নিজে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দিয়েছেন কি না, সে তথ্যও প্রতিবেদনে নেই। ফলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা কঠিন।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সত্য হলে এটি গুরুতর ঘটনা। জোর করে সই আদায়, শারীরিক লাঞ্ছনা ও সরকারি সম্পত্তি নিয়ে যাওয়া ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে। আইনি দৃষ্টিতে জোর করে আদায় করা পদত্যাগপত্রের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। কারণ পদত্যাগ স্বেচ্ছায় না হলে তা কার্যকর হয় না বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ‘দোসর’ তকমা দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগে বাধ্য করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত ও আইনি পথে নিষ্পত্তি হওয়াই নিয়ম। উচ্ছৃঙ্খল দলবদ্ধ চাপে পদত্যাগ আদায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। এ ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বন্ধ এবং ফটকে তালা দেওয়ায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজে সাময়িক স্থবিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের অপেক্ষার কথা বলা হলেও ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকলে অভিযোগ দিতে দেরি হতে পারে। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ঘটনার তদন্ত করলে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করা সহজ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত চালু করা এবং উপাচার্য ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি।

