জাপানে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন অনেক বাংলাদেশি তরুণ। কারও লক্ষ্য ভালো শিক্ষা, কারও আশা পড়াশোনা শেষে চাকরি করে নিজের ও পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন আনা। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণে যে বিপুল অর্থ খরচ হবে, তা কি পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে উঠে আসবে? জাপান সরকারের শিক্ষার্থী সহায়তা সংস্থা জাসসোর হিসাবে, ২০২৫ সালের ১ মে পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৩৯২, যা এক বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। সংখ্যাটি জাপানে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে খরচ, ঋণ, ভাষাগত দক্ষতা ও চাকরির অনিশ্চয়তার মতো প্রশ্ন। বিশেষ করে, এজেন্সির আয়ের প্রতিশ্রুতি শুনে ঋণ নিয়ে যাঁরা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য ঝুঁকির হিসাবটা আরও জরুরি। কারণ জাপানে পৌঁছানো আর পড়াশোনা শেষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এক বিষয় নয়।
মেনে নেওয়ার বদলে যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ
আগে দেশের দিকটা দেখা যাক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ বলছে, দেশে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকার। স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মানে যত বেশি পড়াশোনা, কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তাও তত বেশি। এমন সময়ে কেউ যদি শোনে, এমন একটা দেশে পড়া যায় যেখানে টিউশন ফি যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো নয়, পড়ার ফাঁকে কাজ করা যায়, আবার পড়া শেষে চাকরির সুযোগও আছে, তাহলে সেটা টানবেই। জাপানের নিজস্ব সরকারি তথ্যই বলছে, সেখানে পড়ার খরচ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের চেয়ে কম।
জাপানেরও বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন বাড়ছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে সেখানে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা রেকর্ড ২৫ লাখ ৭১ হাজারে পৌঁছায়। এক বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন খাতে কর্মীর ঘাটতি এর অন্যতম কারণ। বিদেশি শিক্ষার্থী আনার ক্ষেত্রেও জাপান সরকার বড় লক্ষ্য নিয়েছিল। ২০২৩ সালে দেশটি ঘোষণা দেয়, ২০৩৩ সালের মধ্যে ৪ লাখ বিদেশি শিক্ষার্থী আনার লক্ষ্য পূরণ করা হবে। সেই লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই পূরণ হয়েছে।
তবে বাংলাদেশে জাপানে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে যেসব প্রচার চলছে, সেগুলোর সবকিছু যাচাই করে দেখা জরুরি। ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায় জাপানি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সংগঠনের সেমিনারে বক্তারা এক বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী জাপানে পাঠানোর লক্ষ্যের কথা বলেন। শিক্ষার্থী পাঠানোর খরচ ধরা হয় আনুমানিক ৫ লাখ টাকা। এ সময় ব্যাংক ঋণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এর কয়েক মাস আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, জাপানে ন্যূনতম মাসিক বেতন বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ টাকার সমান। তবে সেই বক্তব্য ছিল কর্মীদের বেতন নিয়ে, শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন আয়ের বিষয়ে নয়।
এসব তথ্য বা বক্তব্য যে ভুল, তা বলা হচ্ছে না। কিন্তু যে সংগঠন শিক্ষার্থী পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কথা বলছে, সেটি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন। শিক্ষার্থী বাড়লে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই শুনে মেনে নেওয়ার বদলে যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪১ শতাংশ
জাসসোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ মে পর্যন্ত জাপানে মোট বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন ৪ লাখ ৮ হাজার ৬৯ জন। এক বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অংশ ২ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, নেপালি শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। জাপানের মোট বিদেশি শিক্ষার্থীর ২৪ দশমিক ৬ শতাংশই নেপালের।
অর্থাৎ, জাপানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় তাঁদের অংশ এখনো ছোট। তবে সংখ্যার ভেতরে তাকালে আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে জাপানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন ৭ হাজার ২৪৯ জন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ১৫৭, অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে, জাপানি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ হাজার ১৪৩ জন, যা আগের বছরের ২ হাজার ৪৪০ জনের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি।
ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনজনের একজনেরও বেশি তখনো জাপানি ভাষা শেখার পর্যায়ে ছিলেন। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। জাসসোর হিসাবে বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই ৭ হাজার ২৪৯ জনের মধ্যে কতজন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কতজন বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন, তার আলাদা হিসাব যাচাই করা সারণিতে পাওয়া যায়নি।
এই তথ্যের ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য প্রবণতা বোঝা যায়। জাপানে ভাষা শিক্ষার কোর্স সাধারণত সর্বোচ্চ দুই বছরের। জাসসোর পরবর্তী জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশের ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোর্স শেষ করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৮ শতাংশ জাপানেই পরবর্তী ধাপে পড়াশোনা শুরু করেন। সরাসরি চাকরিতে যান প্রায় ১০ শতাংশ।
অর্থাৎ, ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত পরবর্তী শিক্ষার একটি ধাপ। বর্তমানে সেখানে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আগামী এক বা দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারেন। তাঁদের অনেকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করলে ২০২৮ সালের পর এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। এটি সম্ভাব্য প্রবণতার বিশ্লেষণ, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, এখানে ব্যবহৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০২৫ সালের ১ মে এর হিসাব। এর চেয়ে নতুন সরকারি হিসাব প্রকাশিত না হওয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
কোন পথে জাপানে পড়তে যাওয়া যায়, খরচই বা কত
জাপানে পড়াশোনার প্রধান তিনটি পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো বিশ্ববিদ্যালয় ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা। বাংলাদেশে ১২ বছরের স্কুল ও কলেজের শিক্ষা শেষ করলে সাধারণত আবেদনের যোগ্যতা তৈরি হয়। জাপানি ভাষায় পড়ানো কোর্স অনুসরণ করতে সাধারণত জাপানি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার এন২ বা সমমানের দক্ষতা প্রয়োজন হয়। জাপানের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বছরের ভর্তি ফি ও টিউশন মিলিয়ে গড় খরচ প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার ইয়েন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই খরচ প্রায় ১৩ লাখ ইয়েন।
দ্বিতীয় পথ হলো বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা জাপানে সেনমন গাক্কো নামে পরিচিত। এসব প্রতিষ্ঠানে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হয় এবং সাধারণত জাপানি ভাষায় ক্লাস হয়। প্রথম বছরের গড় খরচ প্রায় ১৩ লাখ ইয়েন। ভর্তির জন্য সাধারণত সরকার নির্ধারিত ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ছয় মাস পড়াশোনা করতে হয়। বিকল্প হিসেবে জাপানি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার এন১ বা এন২ পাস কিংবা সমমানের অন্য পরীক্ষায় নির্ধারিত নম্বর থাকতে হয়। দুই বছরের ডিপ্লোমা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে। আর চার বছরের উচ্চতর ডিপ্লোমা শেষ করলে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় পথ হলো জাপানি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া। প্রতিষ্ঠান ও কোর্সভেদে এক বছরের খরচ ৬ লাখ ১০ হাজার থেকে ১৯ লাখ ইয়েন পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত এসব প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ দুই বছর পড়ার সুযোগ থাকে। তবে ছাত্র ভিসা পেতে হলে প্রতিষ্ঠানটি জাপান সরকারের তালিকাভুক্ত বা অনুমোদিত হতে হবে। ২০২৬ সালের অক্টোবরের ভর্তি থেকে ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে চাইলে জাপানি ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান থাকার প্রমাণও দিতে হবে। নির্ধারিত পরীক্ষার সনদ অথবা প্রতিষ্ঠানের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই যোগ্যতা দেখাতে হবে। আগে শুধু ১৫০ ঘণ্টা ভাষা শেখার রেকর্ড দিয়েও এই শর্ত পূরণের সুযোগ ছিল।
পড়াশোনার ফি ছাড়াও থাকা ও খাওয়ার খরচ রয়েছে। জাসসোর ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, জাপানে একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর মাসিক জীবনযাত্রার গড় খরচ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ইয়েন। এর মধ্যে বাড়িভাড়া জাতীয় গড়ে প্রায় ৪১ হাজার ইয়েন। টোকিওতে বাড়িভাড়ার গড় প্রায় ৫৭ হাজার ইয়েন। এই হিসাবে পড়াশোনার খরচ অন্তর্ভুক্ত নয়। ইয়েনের বিনিময়মূল্য পরিবর্তিত হয় বলে বাংলাদেশি টাকায় মোট খরচ হিসাব করার সময় সংশ্লিষ্ট সময়ের বিনিময় হার ব্যবহার করা প্রয়োজন।
বৃত্তির সুযোগ রয়েছে, তবে তা সীমিত। জাপান সরকারের এমইএক্সটি বৃত্তিতে টিউশন ফি মওকুফ, বিমানভাড়া এবং মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। গবেষণার শিক্ষার্থীরা মাসে ১ লাখ ৪৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার ইয়েন এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মাসে ১ লাখ ১৭ হাজার ইয়েন পর্যন্ত ভাতা পান। স্নাতক পর্যায়ে আবেদনকারীর বয়স ২৫ বছরের নিচে এবং গবেষণার ক্ষেত্রে ৩৫ বছরের নিচে হতে হয়। দূতাবাস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ ও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হয়।
জাসসোর নিজস্ব বৃত্তিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাসে ৪৮ হাজার ইয়েন এবং ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ৩০ হাজার ইয়েন দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ফলাফল প্রয়োজন এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সুপারিশের সুযোগ সীমিত। ২০২৫ সালের মে মাসে জাপানে থাকা ৪ লাখ ৮ হাজার ৬৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে জাপান সরকারের বৃত্তি পাচ্ছিলেন ৯ হাজার ২২১ জন, যা মোটের প্রায় ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে, নিজের খরচে পড়ছিলেন ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮ জন, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের বেশি। সংখ্যাগুলো থেকে বোঝা যায়, বৃত্তির সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে নিজের খরচেই পড়াশোনা চালাতে হয়। তাই পরিকল্পনা করতে হবে নিজের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় রেখেই।
পার্টটাইম কাজের আয় কি নিজের খরচ চালানোর জন্য যথেষ্ট
জাপানে পড়ার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ থাকলেও এর নির্দিষ্ট আইনি সীমা রয়েছে। ছাত্র ভিসায় কাজ করতে হলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আলাদা অনুমতি নিতে হয়। সাধারণ সময়ে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮ ঘণ্টা কাজ করা যায়। দীর্ঘ ছুটিতে দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা পর্যন্ত কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে কাজের কারণে পড়াশোনার ক্ষতি করা যাবে না। জাসসোর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পার্টটাইম কাজের আয় পড়াশোনা ও প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার খরচে সহায়তা করার জন্য, বড় অঙ্কের সঞ্চয় বা দেশে টাকা পাঠানোর জন্য নয়। শর্ত ভাঙলে শাস্তি, এমনকি জাপান থেকে বহিষ্কারের ঝুঁকিও রয়েছে।
আয়ের বাস্তব চিত্র বুঝতে জাসসোর ২০২৩ সালের জরিপটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে দেখা গেছে, নিজের খরচে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬৫ শতাংশ পার্টটাইম কাজ করেন। তাঁদের গড় মাসিক আয় প্রায় ৮১ হাজার ইয়েন। এসব কাজের দুই তৃতীয়াংশের বেশি রেস্তোরাঁ ও বিক্রয় খাতে। প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ঘণ্টায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ইয়েনের মধ্যে মজুরি পান। জাপানে ২০২৬ অর্থবছরে গড় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ১৭৭ ইয়েন।
এবার খরচের সঙ্গে আয়ের তুলনা করা যাক। ধরুন, একজন শিক্ষার্থী এমন একটি বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেন, যেখানে প্রথম বছরের খরচ ১৩ লাখ ইয়েন। সেই খরচকে ১২ মাসে ভাগ করলে মাসিক গড় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ইয়েন। এর সঙ্গে থাকা ও খাওয়ার গড় খরচ ১ লাখ ৫ হাজার ইয়েন যোগ করলে মোট মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৩ হাজার ইয়েন।
অন্যদিকে, পার্টটাইম কাজ থেকে গড় মাসিক আয় যদি ৮১ হাজার ইয়েন হয়, তাহলে প্রতি মাসে ঘাটতি থাকবে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার ইয়েন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ তুলনামূলক কম হওয়ায় ঘাটতি কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু সাধারণ হিসাবে তা পুরোপুরি মিটবে না। অর্থাৎ, পার্টটাইম কাজের আয় খরচের একটি অংশ মেটাতে পারে, পুরো খরচ নয়। ঋণ শোধ করা বা দেশে টাকা পাঠানোর মতো অর্থও অনেকের হাতে থাকবে না।
এখানেই বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য। জাসসো সতর্ক করেছে, শিক্ষার্থীদের ঘণ্টায় ৩ হাজার ইয়েন আয় কিংবা মাসে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ইয়েন আয়ের যে প্রতিশ্রুতি কিছু দালাল বা এজেন্সি দিয়ে থাকে, তা মিথ্যা। তাই সম্ভাব্য আয়কে নিশ্চিত ধরে বিদেশে যাওয়ার আর্থিক পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
দালাল বা মধ্যস্থতাকারীকে কত টাকা দিয়েছেন তা নথিভুক্ত করতে হয়
এই ঝুঁকির পেছনে অর্থনীতির একটি পরিচিত ধারণা কাজ করে, যার নাম তথ্যের অসমতা। কোনো লেনদেনে এক পক্ষ অন্য পক্ষের তুলনায় বেশি তথ্য জানলে কম জানা পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই ধারণা নিয়ে কাজের জন্য জর্জ অ্যাকারলফ, মাইকেল স্পেন্স ও জোসেফ স্টিগলিৎজ ২০০১ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান।
জাপানে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এজেন্সি বা মধ্যস্থতাকারী সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, প্রকৃত আয়, ভিসার শর্ত ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে বেশি জানলেও শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবার সব তথ্য নাও জানতে পারেন। ফলে মাসে দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয়ের প্রতিশ্রুতিও তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে।
এই প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে ঋণ নিয়ে জাপানে গেলে শিক্ষার্থীকে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। ঋণ শোধের চাপে তাঁকে বেশি সময় কাজ করতে হতে পারে। বেশি কাজ করলে ক্লাসে উপস্থিতি কমে যেতে পারে। উপস্থিতি কমে গেলে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে সমস্যা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত জাপান ছাড়তে হলেও ঋণের দায় থেকে যায়। জাসসোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনায় যথেষ্ট সময় না দিয়ে কাজ করায় উপস্থিতি কমে যাওয়ার কারণে থাকার মেয়াদ বাড়াতে পারেন না এবং জাপান ছাড়তে বাধ্য হন। ভাষাগত দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করতে পারে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি গবেষণাপত্রেও জাপানি ভাষায় দক্ষতার অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভালো কাজ পাওয়ার সুযোগও অনেকাংশে ভাষাজ্ঞানের ওপর নির্ভর করে।
তবে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় জাপানে কিছু নিয়ম রয়েছে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মানদণ্ডের একটি সংস্করণে বলা হয়েছে, ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীরা দালাল বা মধ্যস্থতাকারীকে কত টাকা দিয়েছেন বা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা নথিভুক্ত করতে হয়। অনুপযুক্ত মধ্যস্থতাকারী যুক্ত থাকলে শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা যায় না। শিক্ষার্থীর মাসিক উপস্থিতি ৮০ শতাংশের নিচে নামলে প্রতিষ্ঠানকে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হয়। উপস্থিতি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ঘোষিত নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি তিন মাসে শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানতে হবে তিনি কোথায় কাজ করছেন এবং প্রতিদিন কত ঘণ্টা কাজ করছেন। কোনো নিয়োগকর্তা একজন শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করালে সে তথ্যও ইমিগ্রেশনকে জানাতে হবে। এসব নিয়মে নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা রয়েছে। যাঁরা নিয়ম মেনে পড়াশোনা করেন, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা সুরক্ষা দিতে পারে। অন্যদিকে, যাঁরা কেবল কাজ করার উদ্দেশ্যে কাগজে শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানে যেতে চান, তাঁদের জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে আগে জাপানে গিয়ে পরে সবকিছু ঠিক করার পরিকল্পনা এখন আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়ার পথ কতটা সহজ
জাপানে পড়াশোনা শেষে কাজের ভিসা পাওয়ার কিছু সুযোগ রয়েছে। দেশটির ইমিগ্রেশন সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ভিসা থেকে কাজের ভিসায় পরিবর্তনের ৪১ হাজার ১৪২টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়। এর মধ্যে ৩৯ হাজার ৭৬৬টি অনুমোদন পায়। অনুমোদনের হার প্রায় ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
এই হার দেখে চাকরি পাওয়া সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। হিসাবটি শুধু তাঁদের নিয়ে, যাঁরা কাজের ভিসার জন্য আবেদন করেছেন। যাঁরা চাকরি পাননি বা আবেদন করার সুযোগই পাননি, তাঁরা এই হিসাবের বাইরে। তাই এই অনুমোদনের হারকে জাপানে পড়তে যাওয়া সব শিক্ষার্থীর চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
জাসসোর পৃথক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ অর্থবছরে বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, স্নাতকোত্তর ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ প্রায় ৬৩ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ জাপানে চাকরি পেয়েছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ জাপানেই আরও পড়াশোনা করেছেন এবং ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ নিজ দেশে ফিরে গেছেন।
বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে, ২০২৪ সালে ৬৮৫ জন কাজের ভিসা পেয়েছেন, যা মোটের ১ দশমিক ৭ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ৬১৪ জন পেয়েছেন ‘প্রযুক্তি, মানবিক জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সেবা’ শ্রেণির ভিসা। ২০১৯ সালে এ ধরনের কাজের ভিসা পেয়েছিলেন ৪৬৭ জন বাংলাদেশি। অর্থাৎ, জাপানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশিদের কাজের ভিসা পাওয়ার সংখ্যা তুলনামূলক ধীরে বেড়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে, বর্তমানে যাঁরা পড়তে যাচ্ছেন, তাঁদের বড় অংশ এখনো পড়াশোনা শেষ করেননি। ভবিষ্যতে আরও বেশি শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে প্রবেশ করলে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য অনুমান, নিশ্চিত তথ্য নয়।
চাকরি পাওয়া গেলেও বেতন ও কাজের ধরন সম্পর্কে বাস্তব ধারণা থাকা জরুরি। সব দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাজের ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৭২ শতাংশের মাসিক বেতন আড়াই লাখ ইয়েনের নিচে। তাঁদের অর্ধেকের বেশি ১০০ জনের কম কর্মী রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে অনুবাদ ও দোভাষীর কাজে, যা মোটের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। জাপানে জীবনযাত্রার গড় খরচ মাসে ১ লাখ ৫ হাজার ইয়েন ধরলে এই আয়ে সঞ্চয়ের সুযোগ থাকতে পারে, তবে তা থেকে রাতারাতি ধনী হওয়ার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
চাকরির ভিসার শর্তও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী ভিসা থেকে কাজের ভিসায় পরিবর্তন করা ব্যক্তিদের ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ পেয়েছেন ‘প্রযুক্তি, মানবিক জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সেবা’ শ্রেণির ভিসা। এই ভিসার জন্য সাধারণত পড়াশোনার বিষয়সংশ্লিষ্ট কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বা জাপানের বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করার যোগ্যতা প্রয়োজন। বিকল্প হিসেবে ১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতাও প্রযোজ্য হতে পারে। বেতন জাপানি নাগরিকদের সমমানের বা তার বেশি হতে হবে। পাশাপাশি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি স্থিতিশীল কি না, সেটিও বিবেচনা করা হয়। তাই শুধু ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষ করলেই সরাসরি এই ভিসা পাওয়া যায় না।
আরেকটি বিশেষ ভিসার সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য জাপানের চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করতে হয়। পাশাপাশি জাপানি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার এন১ পাস অথবা বিজেটি পরীক্ষায় ৪৮০-এর বেশি নম্বর থাকতে হয়। বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জুনিয়র কলেজ শেষ করা শিক্ষার্থীরা এই ভিসার আওতায় পড়েন না। এ ছাড়া নির্দিষ্ট দক্ষতাভিত্তিক শ্রমিক ভিসার সুযোগ রয়েছে ১২টি খাতে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দক্ষতা ও জাপানি ভাষার পরীক্ষা পাস করতে হয়। পড়াশোনা শেষের পর চাকরি নিশ্চিত না হলে, কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আরও এক বছর চাকরি খোঁজার জন্য আলাদা ভিসা পাওয়া যায়।
তবে জাপানের বিদেশি নাগরিক গ্রহণনীতিতে কঠোরতা বাড়ানোর প্রবণতাও রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিদেশি নাগরিকদের গ্রহণ এবং নিয়ম মেনে বসবাস নিশ্চিত করতে সরকার যে সামগ্রিক পদক্ষেপ নির্ধারণ করেছে, সেটিকে ভিত্তি করে শিক্ষার্থী ভিসার যাচাই আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশে ফিরলে জাপানের শিক্ষার মূল্য কতটা
জাপানে পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসা শিক্ষার্থীরা দেশে অন্যদের তুলনায় কত বেশি আয় করেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য জরিপ পাওয়া যায়নি। তাই তাঁদের সম্ভাব্য আয় নিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া ঠিক হবে না। তবে জাপানি ভাষাজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাংলাদেশেও কাজে লাগতে পারে।
জাপানের একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রধান জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে তাঁরা এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিতে প্রস্তুত। জাপানি প্রশিক্ষণ সংস্থার একজন প্রধানও বলেছেন, বাংলাদেশে জাপানি ভাষার শিক্ষকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে জাপানি ভাষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা নিয়ে দেশে ফিরে আসা শিক্ষার্থীদের জন্যও কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি সম্ভাবনা, প্রমাণিত আর্থিক সুফলের হিসাব নয়।
সব হিসাব শেষে কী দাঁড়ায়
অর্থনীতিতে শিক্ষা ও দক্ষতাকে এক ধরনের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণা নিয়ে কাজের জন্য গ্যারি বেকার ১৯৯২ সালে নোবেল পুরস্কার পান। শিক্ষা গ্রহণের সময় একজন মানুষ অর্থ ও সময় ব্যয় করেন, যাতে ভবিষ্যতে তাঁর আয় বাড়ে। বিনিয়োগটি লাভজনক হবে কি না, তা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: মোট খরচ কত, ভবিষ্যতে আয় কতটা বাড়তে পারে এবং সেই আয় পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা।
জাপানে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই হিসাব প্রযোজ্য। টিউশন ফি, থাকা খাওয়া এবং পড়াশোনার সময় অন্য আয় করার সুযোগ হারানোর মতো খরচ শুরুতেই বহন করতে হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে ভালো চাকরি পাওয়া বা আয় বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তাই সম্ভাবনার হিসাবটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, জাপানে পড়াশোনা বাংলাদেশি তরুণদের জন্য ভালো বিনিয়োগ হতে পারে, তবে সবার জন্য নয়। শুধু জাপানে গেলেই আর্থিক লাভ হবে, এমন ধারণার পক্ষে তথ্য যথেষ্ট নয়।
যাঁরা বৃত্তি পান, তাঁদের লাভবান হওয়ার সুযোগ বেশি, কারণ এতে পড়াশোনার খরচ অনেকটাই কমে যায়। একইভাবে, যাঁরা বাংলাদেশে থাকতেই জাপানি ভাষায় ভালো ভিত্তি তৈরি করেন, চাকরির বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় বেছে নেন এবং পার্টটাইম আয়ের ওপর নির্ভর না করে অন্তত প্রথম দেড় বছরের খরচ চালাতে পারেন, তাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। যাঁদের পরিবারের পক্ষে ভবিষ্যতে ঋণ শোধ করা সম্ভব, তাঁরাও তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে থাকতে পারেন। বিপরীতে, যাঁরা বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে শুধু জাপানে গেলেই আয় হবে বলে আশা করেন এবং ভাষা স্কুলের পর কী করবেন, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা রাখেন না, তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এই প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করতে শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এজেন্সি ও সরকারের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের উচিত সম্ভাব্য সব খরচের লিখিত তালিকা নেওয়া, প্রতিষ্ঠানটি জাপান সরকারের তালিকাভুক্ত বা অনুমোদিত কি না যাচাই করা এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও আগাম পরিকল্পনা রাখা। প্রথম বছর পার্টটাইম কাজ না পেলে কীভাবে খরচ চলবে এবং ঋণ কীভাবে শোধ হবে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আগে থেকেই জানা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ভাষা স্কুল এবং বাংলাদেশে তাদের অংশীদারদের উচিত ফি ফেরতের শর্ত পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কোর্স শেষে কোথায় পড়তে গেছেন বা চাকরি পেয়েছেন, সেই তথ্যও স্বচ্ছভাবে জানানো প্রয়োজন। জাপানের নিয়ম অনুযায়ী, স্কুলগুলোকে প্রতিবছর কতজন শিক্ষার্থী পরবর্তী শিক্ষাস্তরে গেছেন বা কাজের ভিসা পেয়েছেন, সেই তথ্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে জানাতে ও প্রকাশ করতে হয়।
বাংলাদেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রেও এজেন্সির জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমিক পাঠানোর জন্য ২৭টি এজেন্সিকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে একটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তবে শিক্ষার্থী পাঠানোর এজেন্সির ক্ষেত্রে একই ধরনের স্বচ্ছ নিয়ম আছে কি না, তা যাচাই করা যায়নি। এমন নিয়ম থাকলে তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা দরকার, না থাকলে কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
ঋণের ব্যবস্থাও এমন হওয়া উচিত, যাতে অর্থ সরাসরি যাচাই করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জমা হয়। জাপানে যাওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের ভাষা, ভিসার শর্ত ও আইনি দায়িত্ব সম্পর্কে যথাযথ ধারণা দেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, এজেন্সিগুলোর উচিত লিখিত চুক্তিতে নির্দিষ্ট ফি উল্লেখ করা এবং ভবিষ্যৎ আয়ের কোনো নিশ্চয়তা না দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত, জাপানে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দিয়ে নেওয়া যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের সঞ্চয়, ঋণের দায়, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং কর্মজীবনের সম্ভাবনা। তথ্যের ঘাটতি যত কমবে, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করা তত কঠিন হবে। এতে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোও উপকৃত হবে। তাই জাপানে পড়াশোনার সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে শুধু যাওয়ার পথ নয়, পুরো যাত্রার খরচ, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার হিসাবও আগে থেকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে।
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

