বাংলার লোকসংগীত জগতের এক অবিস্মরণীয় নাম লালনসম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন। তার প্রয়াণের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ রোববার। দীর্ঘদিন কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগে গত বছরের এই দিনেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
শুধু একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই নয়, লালন সাঁইয়ের দর্শন ও মানবতাবাদী চিন্তাধারাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অনন্য। তার কণ্ঠের মাধ্যমেই লালনের গান দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি লাভ করে।
১৯৫৪ সালের শেষ দিনে নাটোরের সিংড়া উপজেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। তবে তার বেড়ে ওঠা মূলত কুষ্টিয়ায়। শৈশবেই মাগুরায় একজন সংগীতগুরুর কাছে গানের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার।
ষাটের দশকের শেষভাগে রাজশাহী বেতারে তালিকাভুক্ত হয়ে নজরুলসংগীত পরিবেশনের মাধ্য দিয়ে তার পেশাদার সংগীতজীবনের যাত্রা শুরু হয়। সত্তরের দশকের গোড়ায় দেশাত্মবোধক গান গেয়ে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে লালনসংগীতের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং একাধিক বাউল সাধকের কাছ থেকে তালিম নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন এই ধারার একজন প্রতিনিধিত্বমূলক শিল্পী হিসেবে।
লালনের গান ও দর্শনকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে ফরিদা পারভীনের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দেশেই নয়, বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চেও তিনি লালনগীতি পরিবেশন করে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার এই নিরলস সাংগীতিক যাত্রা লালনের বাণীকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তার সংগীত সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক। এছাড়া একটি চলচ্চিত্রের গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা গায়িকার সম্মাননাও অর্জন করেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার প্রতিভার স্বীকৃতি মিলেছে জাপান সরকারের একটি মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক পুরস্কারের মাধ্যমে।
প্রয়াত এই শিল্পীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সংগীত প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। জাতীয় বেতারে প্রচারিত হবে তাকে নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান, যেখানে সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা তার গাওয়া গান পরিবেশন করবেন এবং বাঁশিতে সুর তুলবেন একজন বিশিষ্ট বংশীবাদক।
এছাড়া সন্ধ্যায় একটি সংগীত একাডেমিতেও তাকে স্মরণ করে বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে, যেখানে একাডেমির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তার সংগীতজীবন ও অবদান নিয়ে আলোচনা করবেন। লালনসংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণের এক বছর পরও তার সুরের রেশ এখনো বাংলার লোকসংস্কৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে আছে।

